একচালার দুর্গাপ্রতিমার সামনে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছেন এক ইংরেজ সাহেব। পা দু’টো সামনে ছড়ানো। গায়ে লাল কোট, সাদা ট্রাউজ়ার্স। হাতে একটা গড়গড়ার নল। ভারতে এসে এই বস্তুটির স্বাদ পেয়েছেন তিনি। মাঝেমধ্যে নলে টান দিচ্ছেন। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে যাচ্ছে নাটমণ্ডপের ছাদের দিকে। গম্ভীর মুখে খুঁটিয়ে দেখছেন পুজোর আচার-নিয়ম। কিছুটা দূরে নৈবেদ্য সাজাচ্ছেন দুই মহিলা। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে একজন বললেন, ‘ওই ক্লাইভ সাহেব, ইস্ট ইন্ডিয়া...’। কথাটা শেষ করতে পারলেন না। পাশের মহিলা মুখ ঝামটে উঠলেন, ‘চুপ কর মুখপুড়ি। তোর প্রাণের মায়া নেই?’
ঢাক, কাঁসর বাজছে। কিন্তু কেউ যেন নিঃশ্বাস ফেলছে না। পাশের নাচমহলে তিল ধারণের জায়গা নেই। ঘাঘরা দুলিয়ে বাইজি গাইছেন, ‘অওর কুছ ফরমাইয়ে...।’ কিন্তু বাহবা দিচ্ছে না কেউ। আচমকাই সেই দিকে চোখ গেল ইংরেজ সাহেবের। লাল কোটের উপরে সোনালি জরির কাজে হাত বোলাতে বোলাতে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। হাসিমুখে বলে উঠলেন, ‘বহুত খুব।’ সঙ্গে সঙ্গে যেন হৃদকমলে ধুম লাগল। ইংরেজ সাহেবের পছন্দ হয়েছে, আর কী চাই! মুহূর্তে সব দ্বন্দ্ব-দ্বিধা ভেঙে গেল। ঢাকের তালে নতুন জোর এল, ‘তেরেকেটে তাক, ধিন তা ধিন’।
কতটা ভাঙলে তবে তাকে ধ্বংসস্তূপ বলা যায়? বব ডিলান জানেন না। কবীর সুমনও নয়। হয়তো বাতাস জানে। হয়তো জানে সময়। হাওড়ার আন্দুলের রাজবাড়িও কি জানে তার উত্তর? সময়ের হাতে তার শরীরে ফুটে উঠেছে ক্ষয়ের বর্ণমালা। যেন ছিন্ন বীণা—‘বাজে গো করুণ সুরে’। তবু তাকে ধ্বংসস্তূপ বলতে জিভে বাধে। কারণ, স্মৃতির স্থাপত্য এখনও অটুট। এত ইতিহাস, এত স্থাপত্য, সরকারি স্বীকৃতি। তবু জরাজীর্ণ অবস্থা কাটেনি। অথচ ইতিহাসের কমতি কিছু নেই। কিংবদন্তি বলে, এই রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় একদিন এসেছিলেন লর্ড ক্লাইভ। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে এই প্রাসাদের অলিন্দে পা রেখেছিলেন, সেই বিষয়ে ইতিহাস অনেকটাই নিশ্চিত।
কলকাতা থেকে গাড়িতে ঘণ্টা দেড়েক। ট্রেনে গেলে হাওড়া থেকে আন্দুল স্টেশন। তারপর রিকশা বা ই-রিকশায় মিনিট পাঁচেক। শুধু ‘রাজবাড়ি’ বললেই হবে — যে কেউ দেখিয়ে দেবে। তবে নাম শুনে মেঠো পথ, মাটির বাড়ির কথা ভাবলে ভুল হবে। আন্দুল পুরোদস্তুর মফঃস্বল। একসময় এই জনপদ পরিচিত ছিল ‘দক্ষিণবঙ্গের নবদ্বীপ’ নামে। একেবারে তার বুক চিরে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী। সকাল-সন্ধ্যায় বেদপাঠ আর সামগানে মুখর হয়ে উঠত গোটা এলাকা। এই নদীপথ ধরেই বাণিজ্যে যেতেন শ্রীমন্ত সদাগর। ‘মনসামঙ্গল কাব্য’-এ সেই উল্লেখ পাওয়া যায়। সরস্বতী নদীর গা ঘেঁষে রাজপ্রাসাদ তৈরি করেছিলেন রাজা রামনারায়ণ রায়। তিনি ছিলেন লর্ড ক্লাইভের দেওয়ান। পরে ওয়ারেন হেস্টিংয়ের দেওয়ানও হন। তবে প্রাসাদের আজকের যে রূপ দেখা যায়, সেটা ১৮৩০-এ বংশের চতুর্থ পুরুষ রাজা রামচরণ রায়ের তৈরি। চার বছর পরে, ১৮৩৪ সালে কলকাতার টাউন হলের আদলে মাথা তুলে দাঁড়াল আন্দুল রাজবাড়ি।
প্রাসাদের সামনে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ১২টি বিশাল স্তম্ভ। প্রতিটার উচ্চতা ষাট ফুট। যেন অতীতের শেষ প্রহরী। এটাই এককালের নাচঘর। বলে না দিলে অবশ্য বোঝার উপায় নেই। ভিতরে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত আরও ২০টি স্তম্ভ। প্রতিটার গায়ে ছিল লতাপাতার কাজ। মাথার উপর ঝুলত ঝলমলে ঝাড়বাতি। সন্ধ্যা নামলেই সুর, তাল আর নূপুরের শব্দে মুখর হয়ে উঠত চারদিক। নামী বাঈজি আর নর্তকীদের আসর বসত, অতিথিদের আড্ডায় জমে উঠত বনেদিয়ানা।
নাচঘরের দু’পাশে তিন তলার দু’টি প্রাসাদ। প্রতিটি তলার উচ্চতা প্রায় কুড়ি ফুট। সেই অট্টালিকার কিছু ঘরে আজও মানুষ বাস করেন, ঠিকই। কিন্তু প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে। মাঝের নাচঘরের আর কোনও অস্তিত্ব নেই। ছাদ ভেঙে আকাশ নেমে এসেছে ভিতরে। বর্ষায় বৃষ্টির জলে থইথই করে মেঝে। দেওয়ালের ফাটল বেয়ে মাথা তুলেছে বট-অশ্বত্থের চারা। চারদিকে আগাছা, জঞ্জাল। দেখলে মনে হবে, এ বোধহয় ভূতের বাড়ি। প্রাসাদের সামনে তিন বিঘার মাঠ। সেটাও আর পুরোপুরি রাজপরিবারের দখলে নেই। সময় শুধু প্রাসাদের শরীরে আঁচড় বসায়নি, তার জমি, গৌরব, এমনকী নীরবতাকেও একটু একটু করে গ্রাস করেছে।
আন্দুল রাজবাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে আজও ঘুরে বেড়ায় নানা কিংবদন্তি। লোকমুখে শোনা যায়, প্রথম দুর্গাপুজোয় উপস্থিত ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ। ফিটন গাড়িতে চেপে ১০ হাজার টাকার সন্দেশ নিয়ে এসেছিলেন তিনি। নিবেদন করেছিলেন মা দুর্গার পায়ে। দিয়েছিলেন এক হাজার টাকা প্রণামী, আর ১০৮টি নীলপদ্ম। ইতিহাসের আদালতে অবশ্য এই কাহিনির প্রমাণ মেলে না। তবে লোকস্মৃতিরও তো একটা নিজস্ব সত্য থাকে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে গল্পের শরীরে।
ক্লাইভই নাকি রাজবাড়িতে একটা কামান পাঠিয়েছিলেন। সেই কামান আজও নীরব সাক্ষীর মতো শুয়ে রয়েছে পাশের অন্নপূর্ণা মন্দির চত্বরে। কয়েক বছর আগেও ষষ্ঠীর সকালে তার গর্জন ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। সেই শব্দই জানিয়ে দিত, দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। আশপাশের গ্রামগুলির কাছে ওই কামানের আওয়াজই ছিল দুর্গাপুজোর অলিখিত ঘড়ি। চোদ্দ শিবমন্দির এবং অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন রাজা রামনারায়ণই। সেই প্রতিষ্ঠার মাহাত্ম্য এতটাই ছিল যে, ১৮৪৫-এ ‘সমাচার চন্দ্রিকা’
পত্রিকায় তা নিয়ে প্রকাশিত হয় দীর্ঘ প্রতিবেদন। আবার জ্ঞানেন্দ্র কুমার সংকলিত বংশপরিচয় (আন্দুল রাজবংশ), তৃতীয় খণ্ডেও মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন আয়োজিত মহোৎসবের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।
শুধু জমিদারি বা ঐশ্বর্যের গমক নয়, আন্দুল রাজবাড়ির সঙ্গে বিদ্যাচর্চার ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে। ১৯১১-য় ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার পরে স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছিলেন রাজপরিবারের সদস্যরা। আবার ১৯১৩-য় নোবেল পুরস্কার জয়ের এক বছর পরে, ১৯১৪-র দুর্গাপুজোর অষ্টমীতে একই মর্যাদায় বরণ করে নেওয়া হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। ‘দক্ষিণবঙ্গের নবদ্বীপ’ নামে খ্যাত আন্দুল ছিল সংস্কৃতচর্চা ও পাণ্ডিত্যের অন্যতম পীঠস্থান। সেই ধারাকে লালন করত রাজপরিবার। কাশী থেকে আন্দুল — অসংখ্য পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণের কাছে নিয়মিত মাসোহারা পৌঁছে যেত রাজবাড়ি থেকে। বিদ্যাচর্চায় যেন অর্থ বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
‘জলসাঘর’ বললেই যেমন নিমতিতার রাজবাড়ির কথা মনে পড়ে, তেমনই গুরু দত্ত মানেই আন্দুল রাজবাড়ি। হিন্দি ছবির স্বর্ণযুগে তৈরি হয়েছে ‘সাহেব বিবি অউর গুলাম’। রাজবাড়ির নাচঘরে ছবির শুটিং করেছিলেন গুরু দত্ত। যে বারান্দায় একদিন জমিদারদের পায়ের শব্দ শোনা যেত, সেই একই অলিন্দ ধরে হেঁটেছিলেন মীনাকুমারী, গুরু দত্ত, ওয়াহিদা রহমানের মতো কিংবদন্তিরা। বহু বাংলা সিনেমা, টেলিফিল্ম। বিজ্ঞাপনচিত্রে বার বার ফিরে এসেছে আন্দুল রাজবাড়ির টানা বারান্দা, দীর্ঘ করিডর। শুটিং করেছেন স্বয়ং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও।
রাজপরিবারের অধিকাংশ সদস্যই কলকাতায় থাকেন। কেউ বা ভিন রাজ্যে। বিদেশেও থাকেন অনেকে। তবে রাজবাড়ির মায়া কাটিয়ে যেতে পারেনি কেউ কেউ। রাজপরিবারের জামাই অরূপেশ ভট্টাচার্যের কথায়, ‘রাজবাড়ির দুই প্রান্তে পরিবারের কয়েক জন সদস্য থাকেন। তবে নাচঘরের অবস্থা সবচেয়ে বিপজ্জনক। পুরোনো দিন সবই স্মৃতি।’ সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে বাংলার ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। ডোমজুড়ের বিধায়ক তাপস মাইতি বিষয়টা জানতেন না। তিনি বললেন, ‘খতিয়ে দেখব।’
আন্দুল রাজবাড়িও যেন এক টুকরো বাংলা। ক্ষয়ে গিয়েছে কিন্তু তবু দীপ্ত। আহত, তবু অনমনীয়। রাজবাড়ির স্তম্ভের পায়ের কাছে যখন শেষ বিকেলের রোদ আদুরে বিড়ালের মতো লুটোপুটি খায়, তখন মনে হয়, এই প্রাসাদ আজও কারও অপেক্ষায় রয়েছে। হয়তো এমন এক দিনের, যখন আবার তরুণ ঢাকি নেচে নেচে বোল তুলবে, ঝাড়বাতির টুংটাং আলোয় মিশে যাবে ভজনের সুর। সে মনেপ্রাণে চায়, ইতিহাসের আর্কাইভে নয়, ভাঙা কার্নিশে, খসে পড়া পলেস্তরা সরিয়ে কেউ তাকে পড়ুক। আর যদি সে সব কিছুই না হয়, তা হলে অন্তত পুনর্জন্ম হোক।