গণআন্দোলনে ফুঁসছে দেশ, দিল্লির বিক্ষোভ ছড়াল পাটনা থেকে সুরাত, প্রবল চাপে মোদি সরকার
বর্তমান | ২৩ জুলাই ২০২৬
সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: নোট বাতিল নয়। সিএএ নয়। এসআইআর নয়। রাজনীতি, ভোট কিংবা সরকারের নীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্কও নেই। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন নয়। নেই জাতিধর্মের ঘোষণা। যে দেশের ৬৫ শতাংশ জনসংখ্যার বয়স ৩৫ বছরের নীচে, সেই যুবপ্রধান ভারতের নতুন প্রজন্ম একান্তই নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষার দাবিতে গর্জন তুলেছে দেশজুড়ে। জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে। যে আন্দোলন নিয়ে সরকার ভেবেছিল যন্তরমন্তরে সূচনা এবং যন্তরমন্তরেই শেষ, সেই বিক্ষোভের আঁচ বিদ্রোহের শিখার মতো ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যে রাজ্যে। সোমবারের সংসদ অভিযানের পর ক্রমেই ককরোচ জনতা পার্টির নিট সংক্রান্ত প্রতিবাদ ও ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবির ধ্বনি দ্রুত প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করেছে দেশজুড়ে। সিজেপির মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। এই প্রথম দলের থেকে বড়ো হয়ে গিয়েছে ইস্যু। তাই কোথাও আইসা, কোথাও এসএফআই, কোথাও বেরোজগার যুব সংঘ, কোথাও গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টি, কোথাও আবার ছাত্র-যুব মোর্চার ব্যানারে রাস্তায় নেমেছে যুবসমাজ। আমেদাবাদ-সুরাত থেকে পাটনা। হায়দরাবাদ থেকে বেঙ্গালুরু। জয়পুর থেকে গোয়া। দেরাদুন থেকে গুয়াহাটি। চণ্ডীগড় থেকে কোচি। পাটনার আন্দোলনে কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জে উত্তাল হয়েছে রাজপথ। সেখানে যুবসমাজের লোকভবন অভিযান আটকাতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করেছে। কোয়েম্বাটোরের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রোডে হয়েছে বিক্ষোভ-অবস্থান-পদযাত্রা। মঙ্গলবার শুরু হওয়া সুরাতের যুব আন্দোলন বুধবার তীব্রতর হয়। মুম্বইয়ের চেম্বুর থেকে আজাদ ময়দান—সর্বত্র রাতভর চলছে বিক্ষোভ। এই প্রথম ১২ বছরের একচ্ছত্র দাপুটে রাজত্বের পর মোদি সরকার প্রবল নার্ভাস। কতটা টেনশনে কেন্দ্র? যে সোনাম ওয়াংচুক ২০ দিন ধরে অনশন করলেও যন্তরমন্তরে এসে অনশন ভাঙানোর ব্যাপারে স্রেফ উদাসীন থেকেছে মোদি সরকার, তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে মঙ্গলবার গুরুগ্রামের মেদান্ত হাসপাতালে পৌঁছে যান দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ও জগৎপ্রকাশ নাড্ডা। তাঁরা সোনাম ওয়াংচুককে অনুরোধ করেন, ‘আপনি বিক্ষোভকারীদের বলুন আন্দোলন প্রত্যাহার করতে। আমরা শিক্ষানীতির সংস্কার প্রক্রিয়া করছি।’ এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, বুধবার ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে ফের বৈঠক করতে চেয়ে বার্তা দিয়েছেন নাড্ডা। এবার ককরোচ বুঝেছে, সরকার যথেষ্ট নড়বড়ে। আর তাই তারা শর্ত রেখেছে, আমরা আর মন্ত্রীর বাসভবনে যাব না। অন্য কোথাও দেখা করতে তিনি রাজি থাকলে আলোচনা হতে পারে।
একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেফাঁস মন্তব্য। সরকারের দায় অস্বীকার। এই ত্র্যহস্পর্শে দেশজুড়ে ক্ষোভের যে বিস্ফোরণ ঘটছে, তার রেশ বুধবারও দেখা গেল সংসদ থেকে রাজপথে। রাজ্যে রাজ্যে একদিকে যুবসমাজের বিক্ষোভ-আন্দোলন আছড়ে পড়েছে, তেমনই সংসদের দুই কক্ষে সরকার ও বিরোধীদের সংঘাতও চরম আকার নিয়েছে। সংসদে বিরোধী দল এবং সড়কে যুবসমাজ, সাদৃশ্য একটিই—উভয় পক্ষই জানিয়ে দিয়েছে তাদের শর্ত, আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। সংসদে বুধবার লোকসভায় সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, ‘আমরা নিট নিয়ে, যন্তরমন্তরের আন্দোলন নিয়ে আলোচনায় রাজি।’ কিন্তু কংগ্রেসের কে সি বেণুগোপাল থেকে সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবদের সম্মিলিত অবস্থান হল, ‘আলোচনা হতেই পারে, কিন্তু আগে ইস্তফা দিতে হবে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে।’ রাজ্যসভায় বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করে নাড্ডা বলেন, ‘বিরোধীরা অপরিণতমনস্ক আচরণ করছে।’ পালটা কংগ্রেসের মল্লিকার্জুন খাড়্গের দাবি, ‘শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে।’
দিল্লির যন্তরমন্তরের বিক্ষোভকারীরা ফের হাজির হয়েছে সড়কে। সোমবার দিল্লি পুলিশের লাঠির ঘায়ের পর, মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়েও। জানা যাচ্ছে, পুলিশ সেদিন ব্যবহার করেছে পেলেট গান। যে ‘ছর্রা’ চোখে লাগলে অন্ধত্ব নিশ্চিত। পুলিশের হাতে অস্ত্র ছিল তীক্ষ্ণ লোহা লাগানো লাঠি। সাদা পোশাকে লাঠি হাতে কারা ছিল? প্রাইভেট বাউন্সার? প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি দিল্লি পুলিশ।
নেপাল নয়। বাংলাদেশ নয়। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস কিংবা নির্বিচারে নৈরাজ্য ও তাণ্ডব সৃষ্টিও নয়। যন্তরমন্তর থেকে আজাদ ময়দান। যুব সমাজের আন্দোলনের অস্ত্র অনশন, অবস্থান এবং অহিংস।