এই সময়: বৃষ্টির মেয়াদ বড়জোর দেড় থেকে দু’ঘণ্টা। কিন্তু তার মধ্যেই কখনও ৮৮ মিলিমিটার, কখনও ৬২ মিমি আবার কখনও ৫৯ মিমি বৃষ্টি পেয়েছে কলকাতা। এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি বৃষ্টি হওয়ার ফলে নিকাশি ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত জলে থইথই অবস্থা। একবার–দু’বার নয়, স্বল্পমেয়াদি অথচ তীব্র বৃষ্টির প্রবণতা গোটা দেশেই উর্ধ্বমুখী। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের হিসেব, ২০৩০–এর মধ্যে অর্থাৎ সামনের চার বছরে গোটা দেশে এমন চরম বৃষ্টির ঘটনা অন্তত ৪৩ শতাংশ বাড়তে চলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতে আরও প্রকট আকার ধারণ করতে চলেছে — এমনটাই আশঙ্কা জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের। দেশজুড়ে একদিকে যেমন তাপপ্রবাহের দাপট বাড়বে, অন্যদিকে তেমনি বাড়বে অতি ভারী ও অনিয়মিত বৃষ্টির ঘটনাও। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা আইপিই গ্লোবাল এবং ভূ-তথ্য প্রযুক্তি সংস্থা এসরি ইন্ডিয়া–র যৌথ সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক পূর্বাভাস।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গত তিন দশকে ভারতে চরম আবহাওয়ার প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ১৯৯৩ থেকে ২০২৪–এর মধ্যে মার্চ-মে এবং জুন-সেপ্টেম্বর সময়কালে চরম তাপপ্রবাহের দিনের সংখ্যা প্রায় ১৫ গুণ বেড়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, শুধুমাত্র গত এক দশকেই এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৯ গুণ। গবেষকদের পূর্বাভাস, ২০৩০–এর মধ্যে মুম্বই, চেন্নাই, দিল্লি, সুরাট, থানে, হায়দরাবাদ, পাটনা ও ভুবনেশ্বরের মতো বড় শহরগুলিতে তাপপ্রবাহের দিনের সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে চলেছে। কলকাতাও খুব স্বস্তিদায়ক অবস্থায় নেই।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে অতি ভারী ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত। সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, দেশের প্রতি ১০টি জেলার মধ্যে অন্তত আটটিতেই ২০৩০–এর মধ্যে বছরে একাধিকবার চরম ও অস্বাভাবিক বৃষ্টির ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে ইতিমধ্যেই অনিয়মিত ও প্রবল বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। পুনের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজি (আইআইটিএম)–এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২০২৬–এর ২২ জুলাই পর্যন্ত কলকাতায় ১১ বার ভারী বৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৫–এ এমন ঘটনা ঘটেছে সাত বার। কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৬৫ মিমি–র বেশি বৃষ্টি হলে তাকে আবহবিদরা ‘ভারী বৃষ্টি’ বলে উল্লেখ করেন। আগামী দিনে এই আশঙ্কা তীব্রতর হতে চলেছে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহপ্রবণ এলাকার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিক বৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়ছে। গবেষকদের মতে, স্থানীয় জলবায়ুর অতি দ্রুত পরিবর্তন, ভূমির ব্যবহার ও চরিত্র বদল, বনভূমি ধ্বংস, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ দখলের মতো কারণ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সমীক্ষার প্রধান লেখক এবং আইপিই গ্লোবালের জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান অবিনাশ মহান্তির মতে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারত ইতিমধ্যেই চরম তাপ ও বৃষ্টির ঝুঁকিতে পড়েছে। ২০৩০–এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে এবং শহরাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ তাঁর মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের জলতলের উত্তপ্ত পরিস্থিতি অর্থাৎ এল নিনিও ও জলতল অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে যে লা নিনা পরিস্থিতি তৈরি করে, বিশ্বব্যাপী সেই ধরনের আবহাওয়াগত ঘটনাও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর প্রভাবেই বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং তীব্র তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গবেষকরা জেলা স্তরে বিস্তারিত ভাবে ঝুঁকির মূল্যায়ন, ক্লাইমেট রিস্ক অবজ়ারভেটরি গঠন এবং জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা কমিটিতে তাপপ্রবাহ-ঝুঁকি বিষয়ক বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক নিয়োগের সুপারিশ করেছেন। তাঁদের মতে, কৃষি, শিল্প এবং পরিকাঠামোকে ভবিষ্যতের জলবায়ুজনিত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।