বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের যন্ত্রণা, জাতীয় দল থেকে অবসরের ইঙ্গিত এমি মার্টিনেজের
প্রতিদিন | ২৩ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে কদর্য হার। ফাইনাল শেষে স্পেনীয় ফুটবলারদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সম্ভাব্য শাস্তির মুখে পড়া। উনচল্লিশ বছরের লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ার নিয়ে জল্পনা। সর্বশেষ, আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত গোলকিপার এমিলিয়ানো (ডিবু) মার্টিনেজের (Emiliano Martinez) জাতীয় দল দলে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছেপ্রকাশ।
সব মিলিয়ে, আর্জেন্টিনা ফুটবলের সময়টা ভালো যাচ্ছে না। একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। স্পেনের বিরুদ্ধে সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ফুটবলারদের মধ্যে একমাত্র উজ্জ্বল ছিলেন গোলকিপার মার্টিনেজ। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি সে দিন বারের নিচে না থাকলে, আরও কুৎসিত হার কপালে লেখা ছিল আর্জেন্টিনার। কাপ ফাইনালে রেকর্ড এগারোটা সেভ করেন মার্টিনেজ। যা আজ পর্যন্ত কোনও গোলকিপার বিশ্বকাপ ফাইনালে করে দেখাতে পারেননি। তবে মার্টিনেজের পক্ষেও শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি দেশের হার বাঁচানো।
মুশকিল হল, এরপর তেত্রিশ বছরের আর্জেন্টিনা গোলকিপার দেশের হয়ে আর খেলবেন কি না, সন্দেহ। এমনিতেই উনচল্লিশ বছরের মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা চলছে বিস্তর। বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার এখনও জানাননি, তিনি কী করবেন? কিন্তু মার্টিনেজ মঙ্গলবার বলে দিলেন, জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা তিনি ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন।
‘সত্যিটা হল, আমি আবার আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিততে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম, ট্রফিটা ধরে রাখতে। ইতিহাস সৃষ্টি করতে। কিন্তু সেটা আর হল না। ভেতরে যে যন্ত্রণাটা চলছে, তা বলে বোঝানো অসম্ভব। বেশ কয়েকটা বিষয় নিয়ে ভাবার রয়েছে। আর্জেন্টিনার হয়ে আর খেলব কি না, সেটাও ভেবে দেখতে হবে,’ সোশাল মিডিয়ায় লিখে দিয়েছেন মার্টিনেজ। সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘খুব খারাপ লাগছে। দেশকে সাহায্য করতে, টিমকে সাহায্য করতে, নিজের সেরাটা দিয়েছিলাম আমি।’
আর্জেন্টিনার হারের মধ্যে মার্টিনেজের অসমসাহসী গোলকিপিং যতটা প্রশসিংত হচ্ছে, ঠিক ততটাই আবার নিন্দিত হচ্ছে পারেদেস-ওটামেন্ডি-মোলিনাদের আচরণ। ফাইনাল শেষে স্পেনের এরিক গার্সিয়া-গাভির সঙ্গে রীতিমতো ‘বক্সিং’ শুরু করে দেন পারেদেস! প্রথমে গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন। তার পর গাভির ‘বিব’ ধরে হিঁচড়ে তাঁকে মাটিতে ফেলে দেন। যে কারণে, তাঁকে লাল কার্ডও দেখতে হয়। ফিফা গতকালই জানিয়েছিল যে, বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে আর্জেন্টিনা ফুটবলারদের আচরণ নিয়ে তদন্ত হবে। এ দিন সরকারি ভাবে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরুর কথা বলা হল। ফিফার আইন অনুযায়ী, তিন ম্যাচের নির্বাসন হতে পারে পারেদেসদের। কারও কারও আবার মত, শাস্তি আরও কঠোর হলেও বলার কিছু থাকবে না। ২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালি ডিফেন্ডার কিয়েলিনিকে কামড়ানোর অপরাধে উরুগুয়ে স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজকে ফুটবল থেকে চার ম্যাচ নির্বাসিত করেছিল ফিফা।
সত্যি বলতে, বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে বিতর্কের অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েছেন পারেদেস। স্পেনের বিশ্বজয় নিয়ে যত না চর্চা চলছে, আলোচনা হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে আর্জেন্টিনা মিডফিল্ডারের আচরণ নিয়ে। মাদ্রিদে স্পেনের ভিকট্রি প্যারেডে যেমন ‘লা রোখা’ তারকা লামিন ইয়ামাল একটা অতিকায় ব্যানার নিয়ে উঠেছিলেন। যাতে লেখা ছিল– পারেদেস বনাম গাভি, ফাইট অফ দ্য ইয়ার! ফুটবলবিশ্ব আরও চটেছে, আর্জেন্টিনা মিডফিল্ডার নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা না চাওয়ায়। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর সোশাল মিডিয়ায় একটা দীর্ঘ পোস্ট করেছেন পারেদেস। সেখানে দেশবাসীর কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। কিন্তু খেলা শেষে নিজের আচরণ নিয়ে টুঁ শব্দও করেননি। সুইডেনের বিখ্যাত ফুটবলার জ্লাটান ইব্রাহিমোভিচ তো রীতিমতো ফুটছেন পারেদেসকে নিয়ে। বলেছেন, “পারেদেসের কপাল ভালো, সে দিন মাঠে আমার মতো কোনও ফুটবলার ছিল না। আমি মাঠে থাকলে, সোজা ‘হেডবাট’ দিতাম ওকে! তার পর লাল কার্ড দেখলে, দেখতাম। এটা কোনও পেশাদার ফুটবলারের আচরণ? বুঝে পেলাম না, স্পেন প্লেয়াররা কী করছিল? ওরা দেখল যে, ওদের সতীর্থকে আক্রমণ করা হচ্ছে। তার পরেও চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে?”
একেই পারেদেসকে ঘিরে বিতর্কের আগুন জ্বলছে। তার মধ্যে তাতে ঘৃতাহুতি করেছেন তাঁর বোন বারবারা। তিনি আবার বলে দিয়েছেন, “আমরা বিশ্বকাপ জিততে পারিনি, ফাইনালে হেরে গিয়েছি, ঠিক আছে। কিন্তু ইংল্যান্ডকে তো হারিয়েছি। ইংল্যান্ডকে হারানো আমাদের কাছে বিশ্বজয়ের সমান! আমরা জার্সিতে চতুর্থ তারা যোগ করতে পারিনি। কিন্তু অবশ্যই ফকল্যান্ডের উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি!” যা শুনে চটে লাল হয়ে গিয়েছে ব্রিটিশ মিডিয়া। সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের পর আর্জেন্টিনা ফুটবল ঘিরে শোক কম, বিতর্ক বেশি।