দু’দশকের ‘লজ্জা’ কাটিয়ে প্রিয় শহর কলকাতায় আসছেন বিখ্যাত ও বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট ‘সেক্যুলার মিশন’ নামে এক সংগঠনের উদ্যোগে মৌলবাদ বিরোধী এক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। নির্বাসন কাটিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তন এই মুহূর্তে বাংলার সাহিত্য জগতে অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। তসলিমার কলকাতায় ফেরা নিয়ে আবেগাপ্লুত জয় গোস্বামী এবার মুখ খুললেন। এক ডিজিটাল মাধ্যমকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে লেখিকাকে নিয়ে নিজের কথা বলেছেন। ২০০৭ সালে তসলিমা নাসরিনকে যে পরিস্থিতিতে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল, পরবর্তীতে এতবছর ধরে ব্রাত্য থেকেছেন লেখিকা, তার জন্য তিনি নিজেকে ‘অপরাধী’ বলতেও পিছপা হলেন না। জয় গোস্বামীর কথায়, ‘‘অপরাধবোধ নয়, আমি নিজেই অপরাধী।”
শহর থেকে তসলিমার নির্বাসনের নেপথ্যে নিজেকে কেন দায়ী করছেন বর্ষীয়ান কবি? আসলে লেখিকার শহর ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পরবর্তী সময়ই জয় গোস্বামীকে বেশি করে ভাবিয়ে তুলেছে, অন্তর পুড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘কেন আমি বলব, কেউ কেন তাঁকে ফেরানোর জন্য লিখলেন না? আমি তো নিজেই একলাইনও এনিয়ে লিখিনি। গত ১৫ বছরে আমি এই প্রশ্ন তুলিনি বা কাউকে লিখিনি যে তসলিমাকে ফিরিয়ে আনা হোক। এটা নিয়ে অপরাধবোধ নয়, আমি নিজেই অপরাধী। তাহলে তো অন্যদের ভূমিকায় প্রশ্ন তুলতে পারি না। যে বা যাঁরা তসলিমাকে ফেরাচ্ছেন, তাঁরা প্রণম্য।”
২০০৭ সালে তসলিমাকে বিতাড়ন নিয়ে তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করেছেন জয় গোস্বামী। তাঁর কথায়, ‘‘যে শহরকে ভালোবেসে তিনি ছিলেন, স্বাধীনতার সঙ্গে লেখালেখি করছিলেন, রাতারাতি সেই শহর থেকে তাঁকে বিদায় নিতে হয়েছে। একটি বিমানে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এমনকী যার সঙ্গে তিনি সর্বদা বাংলায় কথা বলতেন সেই মিনু, তাঁর বেড়াল, তাকেও নিয়ে যেতে পারেননি। তখনকার সরকার ২৪ জন লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের মতামত নিয়ে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাঁরা সকলেই সিনিয়র ছিলেন। এখন আবার তসলিমাকে ফেরানোর সিদ্ধান্তকে তাঁরাই কয়েকজন স্বাগত জানাচ্ছেন। কিন্তু গত ১৫ বছরে কেউ একবারও তাঁকে নিয়ে বলেননি।”
তসলিমা নাসরিনের সাহিত্য সত্ত্বার প্রতি নিজের আবেগ-অনুভূতির কথাও অকপটে প্রকাশ করেছেন জয় গোস্বামী। যা লেখেন তসলিমা, তাইই তিনি যাপন করেন নিজের জীবনের প্রতিক্ষণে, এমনই মত বর্ষীয়ান কবির। এ প্রসঙ্গে তিনি মহাশ্বেতা দেবী, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে একসারিতে বসিয়েছেন ‘দ্বিখণ্ডিত’ স্রষ্টাকে। জয়ের কথায়, ‘‘আমি যখন তসলিমার কবিতা পড়ি, তখন তাঁর ২৪ বছর বয়স। তখন তিনি লিখেছেন – ‘শৃঙ্খল ভেঙেছি আমি/পান থেকে খসিয়েছি আজীবন সংস্কারের চুন’। তিনি যা লিখেছেন, সেটাই তাঁর নিজের জীবন। এমন নয় যে লেখেন একরকম, আর তাঁর জীবন অন্যরকম। এটা সবাই পারে না। আমারই তো লেখার সঙ্গে জীবনের মিল নেই। মহাশ্বেতা দেবী বাদে আমি এক শঙ্খ ঘোষ আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে এমনটা দেখেছি। আর দেখছি তসলিমাকে। তাঁর লেখাই তাঁর জীবন।”