• অভিনয় ভালো হলে মাথায় তুলে নাচবে, না হলে ছুড়ে ফেলতে এক মিনিটও লাগে না: শঙ্কর চক্রবর্তী
    এই সময় | ২৩ জুলাই ২০২৬
  • টেলিভিশন থেকে বড় পর্দা। নানা চরিত্রে, বিভিন্ন মাধ্যমে চার কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন অভিনেতা শঙ্কর চক্রবর্তী। থিয়েটারের মঞ্চ দিয়ে অভিনয় শুরু তাঁর। মাঝে বেশ কয়েকবছর তাঁকে যাত্রার মঞ্চেও দেখা গিয়েছে। দীর্ঘ দিন পরে আবারও সেই পথে পা রাখলেন অভিনেতা। ‘যাত্রার হাইওয়ে’র জার্নি কতটা এনজয় করছেন শঙ্কর?

    এই সময় অনলাইন: অনেক বছর পরে আবারও যাত্রায় ফেরা...
    শঙ্কর: হ্যাঁ। ২০০৬-এর পরে ২০১০-এ করেছিলাম। সেই সময়ে অনেকগুলো শো করেছিলাম।

    এই সময় অনলাইন: মঞ্চে অভিনয়ের জন্য টেলিভিশন থেকেও বাদ পড়েছেন বহুবার। তবু কেরিয়ারের এ রকম একটা সময়ে কেন নাটক, যাত্রাকেই বাছলেন?
    শঙ্কর: আসলে থিয়েটার আমার আঁতুড়ঘর। আমার অভিনেতা হিসেবে জন্মই থিয়েটারে। তবে যাত্রায় ফেরা দু’টো কারণে। প্রথমত, হাতে সিরিয়ালের কোনও কাজ নেই। দ্বিতীয়ত, সব মাধ্যমেই তো কাজ করা উচিত। যাত্রা তো খুব ভালো একটা মিডিয়া। যেখানে সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়। যাত্রা নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের মিথ রয়েছে। অনেকে ব্যঙ্গ করে বলে না, ‘ভালোই তো যাত্রা করছিস?’ সত্যি বলতে, যাত্রা কিন্তু অত সহজ নয়। খুব কঠিন একটা বিষয়। অত লোকের সামনে পারফর্ম করে তাদের বসিয়ে রাখাটা যদি ঠিকঠাক ভাবে না করা যায়, তা হলে সব গণ্ডগোল। অভিনয় ভালো হলে মাথায় তুলে দর্শক নাচে। যদি না হয়, ছুড়ে ফেলতে এক মুহূর্তও সময় লাগে না।

    এই সময় অনলাইন: টেলিভিশনে অনেক বেশি সময় দিতে হলেও, নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক মেলে। যাত্রা বা নাটকের ক্ষেত্রে তো একটা অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
    শঙ্কর: আমি তো অনিশ্চয়তা জেনেই এই দুনিয়ায় পা রেখেছি। যাত্রা সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে অনিশ্চয়তা নয়। প্রচুর শো হয়। টেলিভিশনে যা পাই, তার থেকে যাত্রা অনেক বেশি টাকা দেয়। ৬ থেকে ৭ মাসের বেশি সময় ধরে হয় যাত্রা। টেলিভিশনের ডাবল টাকা দেয়।

    এই সময় অনলাইন: দীর্ঘ বছরের কেরিয়ারে ইন্ডাস্ট্রির বহু ওঠানামার সাক্ষী। ইন্ডাস্ট্রির ১৫ বছরের অবস্থাও তার অন্যথা নয়, পরিবর্তন কি সুদিন ফেরাল?
    শঙ্কর: আমি ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়িয়েছিলাম ১৯৮৬ সালে। তখন ‘এক্সট্রা’ বলা হত। তার পরে অনেক কাজই করেছি। তবে লোকে আমায় চিনেছে ‘গণশা’ দিয়ে। অর্থাৎ ‘বিবাহ অভিযান’। তবে পরিবর্তনে সুদিন ফিরবে কি না, সেটা নিয়ে বলার সময় এখনও আসেনি।

    এই সময় অনলাইন: খানিক বাধ্য হয়েই কি যাত্রায় ফেরার সিদ্ধান্ত?
    শঙ্কর: না না, বাধ্য হয়ে কেন? যাত্রাও তো কাজ। একটা ইন্ডাস্ট্রি। শুধু শিল্পীরা নন, কলাকুশলী থেকে এই মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ উপকৃত হবেন। যাত্রার মাধ্যমে অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন।

    এই সময় অনলাইন: ধারাবাহিকের ফর্ম্যাটও অনেকাংশে বদলেছে, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করতে কোথাও সমস্যা হয়? অথবা, অ্যাডজাস্ট করাও কি কঠিন হয়ে দাঁড়ায় কোনও ক্ষেত্রে?
    শঙ্কর: ভীষণ সমস্যা হয়। আমরা যখন সিনিয়রদের সঙ্গে কাজ করেছি, তখন সিনিয়ররাও যেমন আমাদের ভীষণ ভালোবাসতেন, তেমনই আমরাও সিনিয়রদের দেখলে দাঁড়িয়ে পড়তাম। দূর থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আসতে দেখলে, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়তাম। এখন বহু ছেলেমেয়ে আছে, যারা দেখেই না। এমনকী, না দেখার ভান করে। উল্টোটাও আছে। বহু ছেলেমেয়ে আছেন, যারা ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজ করছেন। তথাগত (মুখোপাধ্যায়)-এর ছবিতে কিছু দিন আগে কাজ করছিলাম। সৌরসেনী (মৈত্র), ঋষভ (বসু) ওরা খুবই ভদ্র।

    এই সময় অনলাইন: ক্যামেরার সামনে কাজ করার পরে বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাত্রা করা কি একটু কঠিন হবে?
    শঙ্কর: যাত্রার একটা বড় কষ্ট হচ্ছে জার্নি। রাতে ট্রাভেল করায় আমার একটা ভীতি রয়েছে। ২০১০ সালের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমি একবার বহরমপুরে গিয়েছিলাম। ফেরার সময়ে গাড়ি নিয়ে নয়ানজুলিতে ডুবে গিয়েছিলাম। ড্রাইভার ঘুমিয়ে পড়েছিল। যদিও সে যাত্রায় আমরা সবাই প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম। খুব কঠিন একটা কাজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মঞ্চে কাজ করতেই হয়।

    এই সময় অনলাইন: যাত্রার সাজসজ্জা বা পরিকাঠামো আগের তুলনায় উন্নত হলেও এখনও অনেককেই বলতে শোনা যায় ‘ভালোই তো যাত্রা করছিস’ অথবা ‘নাটক করিস না তো’। এই বাঁকা মন্তব্য শুনতে হয়েছে কখনও?
    শঙ্কর: একটা সময়ে পৌরাণিক পালা হত, ঐতিহাসিক পালা হত। এখন সামাজিক পালা হয়। অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে বিষয়টা। ফলে আমার সৌভাগ্য হয়তো এই ধরনের বাঁকা মন্তব্য কখনও শুনতে হয়নি।

    এই সময় অনলাইন: এখনও প্রথম সারির বিনোদন মাধ্যমের তালিকা থেকে দূরেই রাখা হয় যাত্রাকে। আপনাদের মতো তারকা যখন এগিয়ে আসছেন, তখন পরিকাঠামোগত ভাবেও কি আরও কোনও নতুন পথ খুলবে?
    শঙ্কর: রবি ঘোষ যাত্রা করেছেন, দীপঙ্কর দে যাত্রা করেছেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তরুণ কুমাররাও রয়েছেন সেই তালিকায়। আমি আর সোনালি (অভিনেতার স্ত্রী সোনালি চক্রবর্তী) রোম্যান্টিক হিরো-হিরোইনের ভূমিকায় অভিনয় করতাম। ইন্ডাস্ট্রির যত বড় বড় অভিনেতা, সকলে যাত্রা করেছেন। আগে যাত্রায় বেশিরভাগ শো টিকিট কেটে দেখতে হতো। যদি আশিটা শো হয়, তার মধ্যে পঁচাত্তরটা টিকিট কেটে দেখতে হতো। যাত্রাশিল্পীদের ভাষায় যেটাকে বলা হতো ‘চ্যারিটি শো’। এর মধ্যে কিছু শো থাকত ফ্রি শো। এখন বিষয়টা পুরোপুরি উল্টে গিয়েছে। আশিটা শো যদি হয়, তবে মেরেকেটে কুড়ি থেকে পঁচিশটা হয় ‘চ্যারিটি শো’। বেশিরভাগই ফ্রি শো। তবে পরিকাঠামো নিয়ে যদি বলা হয়, তবে আমাদের জন্য টিন দিয়ে আলাদা করে ঘেরা সাজঘর আগেও থাকত, এখনও থাকে।

    এই সময় অনলাইন: সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় যাত্রা অনেকটাই পিছিয়ে, নতুন কোনও চিন্তাভাবনা?
    শঙ্কর: হ্যাঁ, সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব ভালো ভাবেই প্রোমোশন হচ্ছে। রথের দিন আমি গিয়েছিলাম যাত্রার একটি অনুষ্ঠানে, সেখান থেকেই একটা ছোট্ট ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। প্রচুর মানুষ দেখেছেন। ফলে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বলাই যায়।

    এই সময় অনলাইন: যাত্রাশিল্পীরা Social Media Influencer হতে পারেন না নাকি চান না নাকি ভয় পান?
    শঙ্কর: নিশ্চয়ই হতে পারেন। অনেকেই আছেন, যাঁরা শুধুমাত্র যাত্রার বিষয়গুলোই তুলে ধরেন। প্রোমোট করেন।

    সাক্ষাৎকার: সুস্মিতা দে
  • Link to this news (এই সময়)