মদ্যপানের আসর বসত, ঠিক করেছিলাম আর কখনও যাত্রা করব না: মানসী সিনহা
এই সময় | ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রায় দু’দশক পরে যাত্রার মঞ্চে ফিরতে চলেছেন অভিনেত্রী-পরিচালক মানসী সিনহা। মাঝে বহু বছর পর্দাকেই—সিনেমা ও সিরিয়াল—আপন করে নিয়েছিলেন। দু’টি ছবি পরিচালনা করেছেন: ‘৫ নম্বর স্বপ্নময় লেন’ (২০২৪), ‘এটা আমাদের গল্প’ (২০২৪)’। এ বার কি তবে স্ক্রিনের মায়া কাটিয়ে নিজেকে পুরোপুরি মঞ্চে সঁপে দিতে চাইছেন অভিনেত্রী?
এই সময় অনলাইন: হঠাৎ যাত্রায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
মানসী: প্রায় ১৮ বছরে পরে যাত্রায় ফিরলাম। নিজে থেকে যে ফিরলাম, সেটা বলব না। মাঝেও আমার কাছে অফার এসেছিল। অনেক ভাবনা-চিন্তার পরে, মনে হলো হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা ঠিক হবে না। তাই রাজি হয়ে গেলাম।
এই সময় অনলাইন: কেরিয়ার শুরু করেছিলেন তো যাত্রার মঞ্চ থেকেই...
মানসী: হ্যাঁ, ৯৩’তে আমার বিয়ে হলো। ৯৫ সালে ‘নট্টকোম্পানি’-তে জয়েন করলাম। প্রায় বছর দেড়েক তখন যাত্রা করেছিলাম। কিন্তু তার পরে ছেড়ে দিই। আসলে ভীষণ হোমসিক ছিলাম সেই সময়ে। কিন্তু পরে শরীর খারাপ বলে ছেড়ে দিই। তার কিছু মাস পরে যোগ দিলাম ‘রঙ্গনা’য়। সেখানেও বেশিদিন করিনি। মাঝে তো সিরিয়াল, থিয়েটারের অভিনয়ে শুরু হলো। বেশ কিছু বছর পরে ২০০৮ সালে ‘মুক্তমঞ্জরী’-তে আবার যাত্রা শুরু করলাম। সেখানে কাঞ্চনও (মল্লিক) আমার সঙ্গে অভিনয় করত। তবে ওখানে যাত্রা করার অভিজ্ঞতা বিশেষ ভালো ছিল না।
এই সময় অনলাইন: কেন? কী হয়েছিল?
মানসী: মঞ্চের উপরের অভিজ্ঞতা দারুণ। তবে দলের মালিক বিশেষ সুবিধের ছিলেন না। যদিও আমার সঙ্গে সরাসরি কোনও খারাপ ব্যবহার করেননি। আমাকে ‘বড় বুড়ি’ বলে ডাকতেন। কিন্তু পরিবেশটা বিশেষ ভালো ছিল না। উনি এলেই মদের আসর বসত। সেই আসরে জয়েন করার জন্য ডাক আসত। যেতাম না বলে আমাকে নাক উঁচু বলা হতো। কাঞ্চন আমার অস্বস্তিটা বুঝতে পারত। কিন্তু কাজের জায়গায় ও তো আমার হয়ে কিছু বলতে পারে না। কারণ ওকেও তো কাজটা করতে হতো। ১০৬টা শো করেছিলাম। দর্শকও প্রচুর ভালোবাসা দিয়েছিল। তবে ওই অভিজ্ঞতার কারণে ঠিক করেছিলাম, আর যাত্রা করব না।
এই সময় অনলাইন: ১৮ বছর পরে সেই মত বদল করলেন কেন?
মানসী: আমি এখন জয়েন করেছি ‘জয়গুরু নট্টকোম্পানি’-তে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে কোম্পানি চালান। আমি এদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েই জয়েন করেছি। প্রত্যেকে এঁদের সম্পর্কে ভালো ফিডব্যাক দিয়েছেন। তাই রাজি হয়ে গেলাম। তবে আমিও কিছু শর্ত দিয়েছি। সবটাই ওঁরা মেনে নিয়েছেন।
এই সময় অনলাইন: কী কী শর্ত দিলেন?
মানসী: যা পারিশ্রমিক চেয়েছি, তাতেই রাজি হয়েছেন। বলেছি, সকালে এবং রাতে চিকেন স্ট্যু দিতে হবে, ভালো ঘর দিতে হবে, হোটেলে লিফট থাকতে হবে। আমার সব দাবিই মেনে নিয়েছেন। ফলে রাজি না হওয়ার কোনও কারণ নেই। তা ছাড়া বাড়িতেই তো বসে আছি। যাত্রা করলে কিছু টাকাও আসবে। সব দিক ভেবেই জয়েন করলাম।
এই সময় অনলাইন: যাত্রাশিল্পীরা Social Media Influencer হতে পারেন না নাকি চান না নাকি ভয় পান?
মানসী: আমি যখন প্রথম দিকে যাত্রা করেছি, সেই সময় তো সোশ্যাল মিডিয়ার এত বাড়াবাড়ি ছিল না। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়া একটা বড় জায়গাজুড়ে আছে। পর্দায় যাঁরা অভিনয় করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। তার কারণ পর্দার অভিনেতাদের কাছ থেকে দেখার, তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ কম। কিন্তু যাত্রার শিল্পীরা তো লাইভ পারফর্ম করেন। দর্শকের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ অনেক বেশি। ফলে আলাদা করে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দর্শকের কাছে পৌঁছনোর দরকার হয় না।
এই সময় অনলাইন: ধারাবাহিকের কাজ ছাড়লেন কেন?
মানসী: সত্যি কথা বলতে, এখন আর আমাদের নিতে চায় না। কারণ আমাদের পারিশ্রমিক বেশি, সহজে বোকা বানানো যাবে না। আলাদা কমফোর্ট দিতে হবে, নানারকম কম্প্রোমাইজ়ের গল্প আছে। যেগুলো আমাদের সঙ্গে করা যাবে না। যদিও যখন চুটিয়ে কাজ করেছি, কখনওই আমার সঙ্গে কেউ খারাপ ব্যবহার করেনি। তবু সব কিছু তো বদলেছে। তা ছাড়া সিরিয়ালে পার ডে যে টাকা দেওয়া হয়, যাত্রায় তার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া যায়। কিছু দিন যাত্রা করে দেখি। যদি ভালো না লাগে, ফিরে আসার সুযোগ তো আছেই।
এই সময় অনলাইন: যাত্রার এর কথা বললে আপনার মতে কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা উচিত?
মানসী: যাত্রা শিল্পে আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে আমার মনে হয়, নতুন প্রজন্ম আরও অনেক বেশি করে যাত্রা ইন্ডাস্ট্রিতে আসুক। যদিও ইয়ং জেনারেশনের অনেকেই যাত্রায় রয়েছেন। সেই সংখ্যাটা আরও কিছুটা বাড়লে ভালো।
এই সময় অনলাইন: যাত্রায় অভিনয় করার জন্য কখনও ব্যঙ্গের শিকার হয়েছেন?
মানসী: আমি তো কখনও হইনি। কানাঘুষো কিছু কথা তো আসেই। সে সব পাত্তা দিই না। আসলে অনেকেরই ধারণা হলো, যাত্রা মানেই অতি নাটকীয় অভিনয়, বিশাল সাজগোজ। এখন আর সে সব সত্যিই নেই। দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য সব কিছুই খুব মেপে মেপে করা হয়। এখনকার যাত্রা দেখলে ব্যঙ্গ করার রসদ খুঁজে পাবেন না।
এই সময় অনলাইন: নতুন কাজের যাত্রা শুরু কবে থেকে?
মানসী: রিহার্সাল শুরু হবে পরের মাস থেকেই। অক্টোবর থেকে শো। সম্ভবত পঞ্চমীর দিন বেরিয়ে যাব কলকাতা ছেড়ে। বেশ মজা হচ্ছে। এ বছর গোটা পশ্চিমবঙ্গ ঘুরে ঘুরে পুজো দেখতে পারব। আলাদাই অনুভূতি।