ছোটবেলায় আমি আর আমার দিদি প্রচুর নাচের অনুষ্ঠান করতাম। সবাই আমাদের চিনত রুমকি-ঝুমকি নামে। সেই সময় আমাদের সঙ্গে মহুয়াদিও নাচ করতেন। তখন অবশ্য মহুয়া নামটা জানতাম না। কারণ তখন মহুয়াদি সোনালি রায়চৌধুরী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। মহুয়াদির বাবা নীলুদার সঙ্গে আমার মায়ের বেশ সদ্ভাব ছিল। নাচের জগতেই মহুয়াদির সঙ্গে প্রথম পরিচয়। আমরা দুই বোন যে ঘরানার নাচ করতাম, মহুয়াদিও সেই একই নাচ করতেন।
মহুয়াদির সঙ্গে যখন প্রথম দেখা, তখন খুবই রোগা ছিলেন। গালটা ঢোকানো ছিল। তার পরে একদিন জানলাম মহুয়াদি হিরোইন হয়ে গিয়েছেন। 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'-এর নায়িকা হলেন মহুয়াদি। তখন মহুয়াদির চেহারা অনেক বদলে গিয়েছিল। মহুয়াদি অভিনয়ের কেরিয়ার শুরুর পরেও নাচ করতেন। প্রসেনজিতের বাবাকে আমরা সকলেই বিশুদা বলে ডাকতাম। বিশুদা তো খুব ভালো গান গাইতেন। মাঝেমাঝেই বিশ্বজিৎ নাইট হতো। সেই অনুষ্ঠানে আমার আর এক দিদি কৃষ্ণা মানে রানির (মুখোপাধ্যায়) মা, ও গাইত। আমি আর ঝুমকিও নাচ করতাম। মহুয়াদিও সেখানে পারফর্ম করতেন।
তার পরে তো 'দাদার কীর্তি'তে মহুয়াদির সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করলাম। তখন তো মহুয়াদির বিয়েও হয়ে গিয়েছে। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল শুনেছিলাম। শুটিংয়ে একটানা অনেকগুলো দিন একসঙ্গে কাটিয়েছি। শিমুলতলায় আউটডোরে গিয়েছি। সেসব স্মৃতি হলো সম্পদ। মহুয়াদি খুবই মুডি ছিলেন। মাঝেমাঝে কথা বলতেন না। আবার কখনও এমন কথা বলতেন যে, দম ফেলা যেত না। আমার মায়ের সঙ্গেও মহুয়াদির বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল।
সন্ধ্যাদি (রায়) তো আমাদের গডমাদার ছিলেন। সব সময় আমাদের আগলে আগলে রাখতেন সেটে। রোজ বিকালে সন্ধ্যাদি আমাকে ডাকতেন একসঙ্গে বিকালের খাবার খাবেন বলে। মহুয়াদি কিছুতেই যেতে চাইতেন না। খালি মজা করে বলতেন, 'তোরা তো সেই মুড়ি-আলুসেদ্ধ খাবি। আমার ওসব চলবে না। আমি চানাচুর খাব, বেগুনি খাব।' 'দাদার কীর্তি'র পরে একসঙ্গে পর পর অনেকগুলি ছবি করেছি।
মহুয়াদি মাঝেমাঝেই রেগে যেতেন। একবার তো তাপসের (পাল) সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল। মান-অভিমান করে বেরিয়ে গেলেন। তার পরে নিজেই আবার তাপসের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। এমনটাই ছিলেন মানুষটা। একটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমি এনটি ওয়ান-এ শুটিং করছি। হঠাৎ মহুয়াদি মেকআপ রুমে এসে উপস্থিত। দেখলাম মুখ ভার। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করায় জানালেন, মেকআপ কিট-সহ গোটা মেকআপ বক্সটাই চুরি হয়ে গিয়েছে। অনেক দামি দামি প্রোডাক্ট ছিল বক্সে। আমাকে জানালেন, পুলিশে জানিয়েছেন। তার পরে আর বক্সটা ফেরত পেয়েছিলেন কিনা জানা হয়নি।
আবার একদিন শুটিং করছি একসঙ্গে। চোখে পড়ল, মহুয়াদির হাতজুড়ে অসংখ্য কাটা দাগ। খুবই অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম। উত্তরে মহুয়াদি জানালেন, রাগ হয়েছিল। তাই বটি দিয়ে নিজের হাত কেটেছেন। শুনে তো আমি থ। আমি আবার একটু বকাও দিলাম। কিন্তু সিনিয়র অভিনেত্রী, বেশি কিছু তো বলা যায় না। তবে সত্যি কথা বলতে বুঝতে পারতাম, ব্যক্তিগত জীবন বিশেষ ভালো ছিল না। ডিস্টার্বড ছিল।
এত ছটফটে, সুন্দরী মহুয়াদির যে এমন পরিণতি হবে, সত্যিই ভাবিনি। একদিন শুনলান মহুয়াদির শরীর নাকি পুড়ে গিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি। অগ্নিদগ্ধ মহুয়াদির শরীরের যে বর্ণনা শুনেছিলাম, তার পরে আর মহুয়াদিকে দেখতে যাওয়ার সাহস হয়নি। আমি মহুয়াদিকে ও ভাবে দেখতে পারতাম না। পরে মহুয়াদির স্মরণসভাতে গিয়েও বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এসেছিলাম। এমন প্রতিভাবান একজন অভিনেত্রীর, এ ভাবে চলে যাওয়া সত্যিই মেনে নিতে পারি না।
FAQ
কেন মহুয়া রায়চৌধুরীকে স্মরণ করলেন দেবশ্রী রায়?
মহুয়া রায়চৌধুরীর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে তাঁর সঙ্গে কাটানো পুরনো দিনের স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন দেবশ্রী রায়।
দেবশ্রী রায় মহুয়া সম্পর্কে কী বলেছেন?
তিনি মহুয়ার হাসিখুশি স্বভাব, অভিনয়ের দক্ষতা এবং সহকর্মী হিসেবে তাঁর আন্তরিকতার কথা স্মরণ করেছেন।
মহুয়া রায়চৌধুরী বাংলা সিনেমায় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আশির দশকের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী। অসংখ্য সফল ছবিতে অভিনয় করে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।
দেবশ্রী রায় ও মহুয়া রায়চৌধুরী কি একসঙ্গে কাজ করেছিলেন?
হ্যাঁ, তাঁরা একাধিক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং সেই সময়ের নানা স্মৃতিই ভাগ করে নিয়েছেন দেবশ্রী।
মহুয়া রায়চৌধুরীর প্রয়াণ দিবস কবে পালিত হয়?
প্রতি বছর প্রয়াণ দিবস হিসেবে স্মরণ করেন অনুরাগী, সহকর্মী এবং বাংলা চলচ্চিত্র জগতের মানুষ।