সিকিমের সুড়ঙ্গে কোথা থেকে এল মিথেন গ্যাস? কোথায় হতে পারে ভুল..বিশ্লেষণ বিশেষজ্ঞের
News18 বাংলা | ২৩ জুলাই ২০২৬
সিকিমের নামচিতে নির্মীয়মাণ টানেলে মিথেন গ্যাস লিকের ঘটনায় একাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর আশঙ্কার খবর সামনে আসতেই ফের প্রশ্নের মুখে টানেল নির্মাণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাহাড় কেটে উন্নয়নের জন্য টানেল নির্মাণ আজ সময়ের দাবি হলেও, সেই উন্নয়নের আড়ালে শ্রমিকদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়েই উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রকল্প শুরু করাই নয়, নির্মাণের প্রতিটি ধাপে কঠোর সুরক্ষা বিধি মেনে চলাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, একটি টানেলে কাজ শুরুর আগে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, গ্যাস সেন্সর, অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা, ইমার্জেন্সি এক্সিট, রেসকিউ চেম্বার, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সেফটি ড্রিল বাধ্যতামূলক। টানেলের ভিতরে প্রতিনিয়ত অক্সিজেনের ভারসাম্য ও বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। পাশাপাশি, সেন্সরের মাধ্যমে ভূমিধস বা শিলা ধসে পড়ার সম্ভাবনা আগাম শনাক্ত করার ব্যবস্থাও থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে এই সমস্ত নিরাপত্তা প্রোটোকল সর্বত্র কতটা কার্যকরভাবে মানা হয়, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
ড. ইন্দ্রজিৎ রায়চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল ও ফলিত ভূগোল বিভাগ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় জানান, দার্জিলিং-সিকিমের মতো হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলের শিলা তুলনামূলকভাবে নবীন, যেখানে কাদা পাথর ও বেলে পাথরের আধিক্য রয়েছে। এই ধরনের ভঙ্গুর শিলাস্তর অল্প বৃষ্টিতেই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই টানেল নির্মাণের আগে বিস্তারিত ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা, শিলার ধারণক্ষমতা, ভূমির ঢাল, জলপ্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ ভূমিধসের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, একজন দক্ষ জিওলজিস্টের মতামত ছাড়া এমন প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
ড. ইন্দ্রজিৎ রায়চৌধুরী আরও বলেন, ‘‘মিথেন গ্যাসের উৎস নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে টানেল নির্মাণে লোহার কাঠামো জোড়া লাগানোর বিভিন্ন শিল্পকার্যে দাহ্য গ্যাস ব্যবহৃত হয়। তাই ব্যবহৃত গ্যাসের সিলিন্ডার বা অন্য কোনও উৎস থেকে দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, টানেলের ভিতরে গ্যাস শনাক্তকারী সেন্সর ও নিয়মিত বায়ুর মান পরীক্ষা না হলে এমন বিপদ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।’’
বিশেষজ্ঞের মতে, টানেল নির্মাণে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেই হবে না, শ্রমিকদেরও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উত্তরবঙ্গের চা-বাগান এলাকার বহু শ্রমিক এই ধরনের প্রকল্পে কাজ করলেও, তাঁদের অনেকেরই আধুনিক সেফটি প্রোটোকল সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ থাকে না।
সব মিলিয়ে, পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে টানেলের গুরুত্ব নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু উন্নয়নের গতি যেন নিরাপত্তাকে পিছনে ফেলে না যায়, সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, প্রকল্প শুরুর আগে পূর্ণাঙ্গ ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আধুনিক পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।