• ধুঁকছে বাংলার ‘সিন্ড্রেলা কাসল’, পালাবদলে কি হাল ফিরবে ধান্যকুড়িয়ার অতিকায় গায়েন রাজবাড়ির?
    এই সময় | ২৩ জুলাই ২০২৬
  • সৌমেন রায়চৌধুরী

    রাজা বা রাজপাট— কোনওটাই অবশিষ্ট নেই। আছে স্রেফ স্মৃতিটুকু। সেই স্মৃতিচিহ্ন নিয়েই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে অতিকায় অভিজাত প্রাসাদটি। রাস্তা জুড়ে বিশাল ফটক। দু’পাশে বৃত্তাকার স্তম্ভ। তার মাঝে ছোরা দিয়ে এক সাহেব সিংহবধের মূর্তি। ছোটবেলায় যাঁরা রূপকথার জগতে ডুব দিয়েছেন, কলকাতার অদূরে ধান্যকুড়িয়ার এই গায়েন রাজবাড়ির সঙ্গে সিন্ড্রেলা কাসলের মিল খুঁজে পাবেন তাঁদের অনেকে। সেই রাজবাড়িই আজ বয়সের ভারে ধুঁকছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভগ্নদশায় পড়ে রয়েছে ধান্যকুড়িয়ার হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত গায়েন গার্ডেনও।

    প্রায় আড়াইশো বছর আগে ধান্যকুড়িয়ার পাট ব্যবসায়ী মহেন্দ্রনাথ গাইন দুর্গের আদলে ৩৩ বিঘা জমি জুড়ে এই প্রকাণ্ড বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। সেখানে ইংরেজ-জমিদারদের বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল। তাঁদের জন্যই তৈরি হয়েছিল নহবতখানা, অতিথিশালা। এক সময়ে টাকি রোড বরাবর মার্টিন রেল চলত। ধান্যকুড়িয়াতেই তার স্টেশন ছিল। ইংরেজরাও রেলপথে আসতেন এই গাইন গার্ডেনে। ইতিহাসের পালাবদলে বাগানবাড়ির জৌলুস কমেছে। তবে কিছু ভাস্কর্য এখনও রয়ে গিয়েছে। স্থানীয়দের অবশ্য অভিযোগ, খাতায়-কলমে শুধু ‘হেরিটেজ’ তকমাটুকুই মিলেছে। বাস্তবে ভবনের চিত্র বদলায়নি। বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরেছে। তা ছাড়া যে ভাবে সর্বত্র ঘাস-আগাছা গজিয়ে উঠেছে এবং সীমানা পাঁচিল ভেঙে দুষ্কৃতীদের অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটে অহরহ, তাতে এই বিশাল স্থাপত্য অচিরেই নষ্ট হওয়ার মুখে। সেই সূত্রেই ঐতিহাসিক ভবনটি দ্রুত সংস্কারের দাবি উঠেছে ধান্যকুড়িয়ায়।

    জমিদারবাড়ির পঞ্চম প্রজন্মের মনোজিৎ গায়েন বলেন, ‘হেরিটেজ ঘোষণা হলেও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। গায়েন গার্ডেনের হোমে এক সময়ে অনাথ মেয়েদের স্কুল বসত। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা হতো। স্বাধীনতার পরে তা সমাজকল্যাণ দপ্তরের হাতে যায়। ২০০৮ সালে সরকার এই হোম অধিগ্রহণ করে। পরে তৃণমূল জমানায় তা তুলে দেওয়া হয় নানা অজুহাতে। হোমের মেয়েদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করা হয়। আমরা চাই হোমটিকে আবার ফিরিয়ে আনা হোক।’ যদিও প্রশাসনের একটি সূত্রে খবর, হোমের জরাজীর্ণ অবস্থা বিবেচনা করেই সেটি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে।

    অতীতে নানা ছবিরও শুটিং হয়েছে গায়েন রাজবাড়িতে। শোনা যায়, ১৯৬০ সালে গুরু দত্ত, ওয়াহিদা রহমান এবং মীনা কুমারী অভিনীত ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ছবির শুটিং হয় এখানে। এ ছাড়া মহানায়ক উত্তমকুমার অভিনীত ‘সূর্যতপা’ এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের শেষ ছবি ‘সত্যান্বেষী’রও শুটিং ধান্যকুড়িয়ায় হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে হিউ গ্রান্ট পরিচালিত একটি ইন্দো-ফরাসি ছবির শুটিংও হয়েছে বলে শোনা যায়। মনোজিতের অভিযোগ, তৃণমূল জমানায় রাজবাড়িতে ছবির শুটিংও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদিও তাঁর বিশ্বাস, নতুন সরকার আমলে সেই জট কাটবে। মনোজিতের মত, ‘বসিরহাট মহকুমায় মেয়েদের কোনও কলেজ নেই। সেটা এখানেই তৈরি হোক না।’

    স্থানীয়দের মত, এই রাজবাড়িকে সংরক্ষিত করে যদি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাতে স্থানীয় অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াবে। এলাকার বাসিন্দা শিবনাথ পাত্র বলেন, ‘সারা বছর বহু মানুষ এই রাজবাড়ি দেখতে আসেন। পিকনিক করতে আসেন। মহা ধুমধামে দুর্গাপুজো হয়। এই বাড়িটার এমন ভাবে সংরক্ষণ করা হোক, পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক, যাতে এলাকার মানুষজনও উপকৃত হন।’ সমাজকর্মী ছন্দক বাইনের পরামর্শ, ‘যে জায়গাগুলো হেরিটেজ তকমা পেয়েছে, সেখানে আজ পর্যন্ত সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়নি। হেরিটেজ কমিশনকে বলতে চাই, এই বিষয়টা যাতে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।’

    গোটা বিষয়টি বসিরহাটের মহকুমাশাসক জেসলিন কৌর বলেন, ‘আমি দায়িত্বে থাকাকালীন হেরিটেজ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কোনও নির্দেশিকা আসেনি। ফলে আমি জানিই না বিষয়টা সম্পর্কে। তবে পরিবারের তরফে যদি মহিলাদের কলেজ বা হোম তৈরির বিশেষ আবেদন জানানো হয়, সে ক্ষেত্রে বিষয়টা ভেবে দেখা হবে।’

  • Link to this news (এই সময়)