• সংসদ অভিযানে পেলেট ছুড়েছে দিল্লি পুলিশ? দৃষ্টি হারাতে বসেছেন নিট-আন্দোলনকারী
    এই সময় | ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ডান চোখের মণিতে এসে বিঁধেছে দিল্লি পুলিশের ছোড়া পেলেট। তার জেরে দৃষ্টি হারাতে বসেছেন বছর উনিশের নিট-আন্দোলনকারী সাহিল লোচাব। এমনটাই দাবি করেছে তাঁর পরিবার।

    দক্ষিণ দিল্লির নাজাফগড়ের বাসিন্দা সাহিল। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অফ ওপেন লার্নিং’-এর ছাত্র। পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন ছিল সাহিলের। সেই মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। ঘটনাচক্রে, পুলিশের ছোড়া পেলেটেই তিনি জখম হয়েছেন বলে অভিযোগ।

    গত সোমবার, ২০ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র ডাকে সংসদ অভিযানে শামিল হয়েছিলেন বহু পড়ুয়া। সাহিলও তাতে অংশ নিয়েছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হন ওই তরুণ। পরদিন, অর্থাৎ মঙ্গলবার, ২১ জুলাই এইমস ট্রমা সেন্টারে সাহিলের চোখে অস্ত্রোপচার হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর চোখের মণি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ। শীঘ্রই আরও একটি অস্ত্রোপচার হবে।

    যদিও দিল্লি পুলিশ দাবি করেছে, তারা পেলেট গান বা ছররা বন্দুক ব্যবহার করেনি। কিন্তু দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এইমস-এর দাবি, সাহিলের চোখে অস্ত্রোপচারের সময়ে ধাতব পেলেট মিলেছে।

    শেখ এরশাদ মনসুরি নামে আরও এক আন্দোলনকারী পেলেটের আঘাতে জখম হন বলে অভিযোগ। তাঁর পরিবারেরও দাবি, ২৫ বছরের তরুণ এরশাদের চোখে পেলেট বিঁধেছে। লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালের ওয়ার্ডের বেডে শুয়ে এরশাদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘যন্তর মন্তরের সামনে দিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে হাঁটছিলাম। সেই সময়ে লাঠিচার্জ করতে শুরু করে দিল্লি পুলিশ। কাঁদানে গ্যাসও ছোড়ে। তাতে চোখ জ্বলতে শুরু করে আমার। কিছু ক্ষণের জন্য ব্ল্যাকআউটও হয়ে গিয়েছিলাম। পরে উঠে দাঁড়িয়ে এক পুলিশকর্মীকে হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিলাম, আমাদের মারবেন না। আমরা পড়ুয়া। এ দেশের নাগরিক। সন্ত্রাসবাদী নই। এর পরেই ব়্যাফের এক জন এসে বন্দুক তাক করে আমার দিকে। প্রথমে ভেবেছিলাম, উনি ভয় দেখাচ্ছেন। নিশ্চয়ই গুলি করবেন না। কিন্তু সত্যি সত্যিই গুলি চালিয়ে দিল। তার পরে আর কিছু জানি না।’

    এরশাদ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা। যুবক বলেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন। জানিয়েছেন, সরকার গোটা বিষয়টা দেখছে। আমি কেন আন্দোলনে গিয়েছি, তা-ও জানতে চেয়েছিলেন উনি। আমি বলেছি, এটা আমার কর্তব্য ছিল। আন্দোলনকারীদের দাবির সঙ্গে আমি সহমত। তাই গিয়েছি।’

    পেলেট বা ছররা: দিল্লির অনেক আগে বিতর্ক জম্মু-কাশ্মীরে

    প্রসঙ্গত, অহেতুক প্রাণহানি যাতে না হয়, কারও বড়সড় ক্ষতি না করেও যাতে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া যায় জনতাকে, তার জন্যই পেলেট গানের আমদানি। কিন্তু ২০১৭ সালে উত্তাল জম্মু-কাশ্মীরে বিক্ষোভকারী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে তার ব্যবহার নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, বাহিনী কোমরের বেশি উচ্চতায় যথেচ্ছ ভাবে ছররা ছোড়ায় আহত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বহু কাশ্মীরি যুবক। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ছররা বিঁধে মারাও গিয়েছেন অনেকে। বিষয়টি গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।

    তার পরেও পেলেট গানের ব্যবহার বন্ধ হয়নি উপত্যকায়। কেন্দ্রীয় সরকার বাহিনীকে বলেছিল, জনতাকে হটাতে চিরাচরিত জল কামান, কাঁদানে গ্যাসের পাশাপাশি পাভা শেল ব্যবহার করতে। লঙ্কার গুঁড়ো ভর্তি পাভা শেল ফাটলে সাময়িক কিন্তু তীব্র জ্বালা হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থাও ব্যর্থ হলে পেলেট গান ব্যবহার করা হবে। পরবর্তী কালে জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্টও পেলেট গানের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার আর্জি খারিজ করে দেয়। তবে সিদ্ধান্ত হয়, বুঝেশুনে এই বন্দুক ব্যবহার করতে হবে। যাতে কারও চোখে-মুখে তো নয়ই, ডিফ্লেক্টর লাগানো বন্দুক থেকে নির্গত পেলেট যেন কারও কোমরের উপরে আঘাত না করে। তা সত্ত্বেও পেলেটের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক থামেনি। দিল্লির ঘটনা সেই বিতর্ককেই আবার উস্কে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

    'দ্য় কুইন্ট'-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ভিড় নিয়ন্ত্রণে পেলেট শটগানের ব্যবহার নিষ্ঠুরতা ও বিপজ্জনক। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষার মাপকাঠিতে তার ব্যবহার অনিয়ন্ত্রিত ও বেঠিক। মানবাধিকার সংক্রান্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের কমিশন প্রতিবাদকারীদের উপর শটগান থেকে পেলেট ছোড়াকে 'অন্যতম বিপজ্জনক অস্ত্র' অ্যাখ্যা দিয়েছে।

    'দ্য় হিন্দু'-র এক প্রতিবেদন বলছে, পেলেট বা ছররা গুলিতে চোখে দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি হয়, এমনটা জানাচ্ছে মেডিক্য়াল রিসার্চও। শ্রীনগরের বেমিনা-র SKIMS Medical College-এর গবেষণা বলছে (Department of Ophthalmology at SKIMS Medical College, Bemina), ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরে ২০ জন আক্রান্তের ৭৮ শতাংশের চোখের ক্ষত গুরুতর রকমের অকুলার ট্রমা।

    ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কাশ্মীরে ১০ হাজার জনের বেশি মানুষ ছররা গুলিতে জখম হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৭৮২ জন হয় এক চোখে কিংবা দু'চোখেই দৃষ্টিশক্তি হারান।

  • Link to this news (এই সময়)