• ফের নজির গড়ল কলকাতা মেডিকেল কলেজ
    আজকাল | ২৩ জুলাই ২০২৬
  • গোপাল সাহা: 

    ডাক্তারবাবু : কিরে কেমন আছিস? মায়ের কোলে শিশু : ভাল আছি। শিশুর মা : ডাক্তারবাবু, আপনাদের জন্য আমার বাচ্চাটাকে ফিরে পেলাম। 

    আজ থেকে তিন বছর তিন মাস আগে মাত্র এক বছর দুমাস বয়সে পেট ফোলা, পেটে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় কলকাতা মেডিকেল কলেজে আসে চিকিৎসার জন্য। ডাক্তাররা নানান পরীক্ষা করে দেখেন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছোট্ট শিশুটি। নিউরোব্লাস্টোমা অর্থাৎ আদি স্নায়ু কোষে ক্যান্সারের তৃতীয় স্টেজ। যেখান থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা যথেষ্টই কম। একপ্রকার অসাধ্য সাধন ছাড়া আর কিছুই নয়। আর তেমনটাই বাস্তব করে দেখালেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা। আবারও প্রমাণ করল কলকাতা চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোন অংশেই পিছিয়ে নেই, সে দেশ হোক বা বিদেশ। 

    চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের মতে এই ধরনের ক্যান্সারের পাঁচটি প্রকারভেদ রয়েছে। প্রতিটির চরটি করে পর্যায়ে রয়েছে। আর এই ক্যান্সার যথেষ্ট জটিল ও বিরল এবং ব্যয়বহুল। যথা -

    * নিউরোব্লাস্টোমা (আদি স্নায়ু কোষের ক্যান্সার) * জার্মসেল টিউমার (বীজ কোষের ক্যান্সার)* হেপাটোব্লাস্টোমা (লিভারে ক্যান্সার) * উইলমস্ টিউমার (কিডনিতে ক্যান্সার) * রেটিনোব্লাস্টোমা (রেটিনাতে ক্যান্সার) 

    এইগুলি এক ধরনের  বিরল ক্যান্সার যা অপরিণত স্নায়ুকলা (নিউরোব্লাস্ট) থেকে উৎপন্ন হয় এবং এটি সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রভাবিত করে। এটি বেশিরভাগ সময় কিডনির ওপরের অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিতে শুরু হয়। এছাড়াও লিভার, স্পাইন বা চোখ সংলগ্ন টিউমার আকারে দেখা যায়। প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে পেটে ফোলাভাব, ব্যথা, হাড়ে ব্যথা, ক্লান্তি এবং চোখের নিচে কালশিটে পড়া অন্তর্ভুক্ত।

    নিউরোব্লাস্টোমা-সহ এই ধরনের ক্যান্সারে তৃতীয় বা চতুর্থ স্টেজে ধরা পড়লে কিংবা প্রত্যাবর্তন হলে নিজ অঙ্কুর কোস (স্টেমসেল) প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে রোগ মুক্তি সম্ভব। এই ধরনের ক্যান্সারে মূলত তৃতীয় বা চতুর্থ স্টেজে ধরা পড়লে তখন শুধু কেমোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা হলে আবার পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। তবে বেশি মাত্রায় কেমোথেরাপি দিলে তবে সেই কোষগুলি নির্মূল হয়। কিন্তু কেমোথেরাপি বেশি মাত্রায় দাওয়া হলে বোন ম্যারো টক্সিসিটি বা অস্থি মজ্জার কোষগুলি নষ্ট হয় কিংবা অধিক পরিমাণে কমে যায়। যা অদূর ভবিষ্যতের জন্য খুবই বিপদজনক হতে পারে। অর্থাৎ শরীরে হিমোগ্লোবিন বা অনুচক্রিকা বা শ্বেতকণিকা পরিমাণ কমে গেলে মৃত্যু হতে পারে অথবা সংক্রমনের পরিমাণ প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যেতে পারে। এই সময় প্রতিস্থাপিত নিজ অংকুর কোষ রক্তের বিভিন্ন কোষে বিভাজিত হয়ে এই সকল জটিলতা গুলিকে মোকাবিলা করে।

    উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই জাতীয় ক্যান্সার পুনরায় ফিরে এলে অথবা তৃতীয় বা চতুর্থ স্টেজে ধরা পড়লে তাকে প্রথমে অপারেশন ও কেমোথেরাপি দিয়ে ওই টিউমারের সেল গুলিকে নষ্ট করে তারপর নিজ অঙ্কুর কোষ প্রতিস্থাপন করলে এই রোগ থেকে নিরাময় সম্ভব হয়। ভবিষ্যতেও ফিরে আসা সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে পূর্বেও এই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার হয়েছে, যা সাফল্য এনেছে। তবে এবার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় এই প্রথমবার ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে ১ বছর ২ মাসের শিশুর ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ। এত ছোট শিশুর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে এর আগে কখনও প্রয়োগ হয়েছে বলে জানা যায়নি। যা অতীব সাফল্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ হয়েছে। এই চিকিৎসার ক্ষেত্রে নজরদারির রাখার নিয়ম ৩-৪ বছর। এই সময় কাল পার হলে তবেই বলা যায় শিশু শারীরিক ভাবে সুস্থ। আর এই ধরনের ক্যান্সার মূলত আক্রান্ত করে শিশুদের পাঁচ বছরের নীচে। বেসরকারি হাসপাতালে হলে তা অতীব ব্যয়বহুল। একমাত্র সরকারি হাসপাতালে এই চিকিৎসা বিনামূল্যে সম্ভব।

    কলকাতা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা বলেন, যখন তিন বছর বাদে তার মায়ের হাত ধরে হাসপাতালে দেখাতে আসেন, তখন আমরা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হই যে সেই শিশুটি এখন সুস্থ রয়েছে। আমরা আশা করতে পারি যে শিশুটি রোগমুক্ত।  

    কলকাতা মেডিকেল কলেজে এই চিকিৎসার সাফল্য এনেছে একাধিক বিভাগের চিকিৎসকদের যৌথ প্রচেষ্টার ফলে। যার মধ্যে প্রধান কান্ডারী ছিলেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের অঙ্কোলোজি বিভাগের প্রধান ডঃ স্বর্ণবিন্দু ব্যানার্জি, ব্লাড ট্রান্সমিশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডঃ প্রসুন ভট্টাচার্য এবং শিশু বিভাগের প্রধান (পেডিয়াট্রিক মেডিসিন) অধ্যাপক ডঃ কল্পনা দত্ত 

    আমাদের সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অঙ্কলজি বিভাগের প্রধান ডঃ স্বর্ণবিন্দু ব্যানার্জি  বলেন, "যখন ১৪ মাসের এই শিশুটি আসে তার মায়ের সঙ্গে একাধিক কষ্ট নিয়ে, তখনই আমরা চিন্তায় পড়েছিলাম। তারপর যখন জানতে পারি শিশুটির নিউরোব্লাস্টোমা হয়েছে, তখন চিন্তায় পড়ে যাই যে কি করে তাকে ফিরিয়ে দেবো তার মায়ের কোলে। অবশেষে আমরা চিকিৎসকরা মিলে এই শিশুটিকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পেরে আজ বিরাট মানসিক শান্তি পাচ্ছি। সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা এক দীর্ঘ সময় ধরে রক্ত থেকে অংকুর ঘোষ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলে। তিন বছর না কাটলে শিশু সুস্থ আছে কিনা সেটা বোঝা যায় না। তিন বছর বাদে যখন শিশুটি নিজে পায়ে হেঁটে দেখা করতে এলো তাঁর মায়ের সঙ্গে তখন এক বিরাট তৃপ্তি পেলাম।" 

    ব্লাড ট্রান্সমিশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডঃ প্রসুন ভট্টাচার্য বলেন, "এই শিশুটির তখন ওজন ছিল মাত্র ৮ কেজি। আর এইটুকু শিশুটিকে এই রোগের থেকে মুক্তি দিতে বাইরে থেকে রক্তর সাপোর্ট দিয়ে তার শরীরের রক্ত নিয়ে পুরো সিস্টেমটাকে প্রসেস করা হয়। এই প্রক্রিয়া চলে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা। এই জায়গায় বলা যেতে পারে একটি ৮ কেজির বাচ্চার শরীরে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলি লিটার রক্ত থাকে। সেটা চার থেকে পাঁচ গুণ রক্ত অর্থাৎ দু থেকে তিন লিটার রক্তের সাপোর্ট দিয়ে রিপিটেডলি সার্কুলেট করা হয়। আর এই সময় সেই বাচ্চাটির শরীরে নানারকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। যা খুবই বেদনাদায়ক এবং কষ্টকর। এ সময় যে পার্শ্বপ্রতিকরা গুলো হয়, যেমন- রক্ত কমে যাওয়া, ক্যালসিয়াম কমে যাওয়া, রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম সমস্যা তৈরি হয়। একই সাথে শরীরের সোডিয়াম পটাশিয়ামের তারতম্য ঘটে, শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। একই সাথে রক্ত যাতে জমাট না হয় তার জন্য বিভিন্ন রকম ওষুধের ব্যবহার করতে হয় ইনজেকশনের মাধ্যমে। এই সময় এমনকি বমি করা, পেচ্ছাপের সঙ্গেও রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আর এই সময় pediatric অর্থাৎ শিশু বিভাগের ভূমিকা অতিব গুরুত্বপূর্ণ। আর সবচেয়ে বড় বিষয় এই বিরাট কর্মযজ্ঞে যে গুরু দায়িত্বের ভূমিকা পালন করেন অঙ্কোলজি বিভাগ ও শিশু বিভাগ। আমাদের এই তিনটে বিভাগের মেলবন্ধনে এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।  সত্যি কথা বলতে এই সাফল্যে এক অদ্ভুত তৃপ্তি পেয়েছি। বাচাটিকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পেরে এক বিরাট শান্তি পেয়েছি আমরা। আর এই চিকিৎসা পদ্ধতি আমার কাছে আরও বেশি স্মরণীয় তার কারণ, আমরা তিনটে বিভাগ মিলিত হয়ে গঠনমূলকভাবে খুব সুন্দর কাজ করে এই সাফল্য পেয়েছি।" 

    শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডঃ কল্পনা দত্ত বলেন, "এত ছোট শিশুর এই চিকিৎসা এই প্রথম যা সত্যিই বিরাট সাফল্য এনেছে। এই ক্ষেত্রে শিশু বিভাগের দুটি বেগ সংরক্ষণ করে রাখা আছে আমাদের হাসপাতালে। যেখানে এই ধরনের চিকিৎসায় নজরদারিতে রাখতে হয় প্রায় 24 ঘন্টা বা তার বেশি সময়, সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। কারণ নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়, যার জন্য নজরদারি প্রয়োজন। এই বাচ্চাটিকে যে তাঁর মায়ের কোলে আমরা ফিরিয়ে দিতে পেরেছি তার জন্য সত্যিই আমাদের খুব ভালো লাগছে।"

    এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ইন্দ্রনীল বিশ্বাস বলেন, "এই সাফল্য আমাদের হাসপাতালে এক গর্বের বিষয়। শিশুটি যে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পারা গেছে এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। আর এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের কলেজের চিকিৎসকদের যৌথ প্রচেষ্টার ফলে।"
  • Link to this news (আজকাল)