• তাঁর ভাঙা কুঠির সামনে আজও সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে
    এই সময় | ২৪ জুলাই ২০২৬
  • নির্মল বসু , সন্দেশখালি

    আজও সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে ভাঙা বাড়িটার সামনে। সে–ই কবে শেষবার তিনি থেকে গিয়েছিলেন সেখানে।

    আজ তাঁর মৃত্যুদিন। এখনও তিনিই মহানায়ক। তাঁর আসন এক দিনের জন্যও টলেনি। কমেনি তাঁর প্রতি মানুষের অনন্ত ভালোবাসাও।

    ১৯৭৪–৭৫ হবে। ৫০ বছরেরও বেশি পেরিয়ে গিয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালির ভাঙাতুষখালি গ্রামে ‘অমানুষ’–এর শুটিংয়ে এসেছিলেন উত্তমকুমার। গ্রামের মেয়ে–পুরুষ অবাক বিস্ময়ে চোখের সামনে দেখেছিলেন মহানায়ককে। শুটিং হতো রায়মঙ্গল, বড় কলাগাছিয়া, রামপুরা নদীর পাড়ে। খবর পেয়ে দূর দূর থেকে মানুষ ছুটে আসতেন। এখনকার মতো আগল ছিল না। শুটিংয়ের ফাঁকে অবসর সময়ে প্রাণ খুলে গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন মহানায়ক। সুখ–সুবিধের কথা শুনে গরিব মানুষের হাতে টাকাও তুলে দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।

    আজও গ্রামের মানুষ ভোলেনি মহানায়ককে। তাঁর থাকার জন্য যে কাঠের বাড়ি এবং তা লাগোয়া রাধাগোবিন্দর মন্দির বানানো হয়েছিল, সন্ধে নামলেই তার সামনে শ্যামলী মণ্ডল, ঝর্ণা সাহারা আজও প্রদীপ জ্বালেন। এটাই ভালোবাসা। তাঁর প্রয়াণের ৪৬ বছর পরেও যা অটুট। আর প্রয়াণ দিবসে গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে উত্তমের ছবিতে মালা দেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। বয়স্কদের মুখে সে সব দিনের গল্প শোনে আজকের ছেলেমেয়েরা।

    একদিন প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক শক্তি সামন্ত এসেছিলেন সন্দেশখালিতে। গ্রাম ঘুরে ভেবেছিলেন এই প্রত্যন্ত গ্রামে উত্তমকুমার, উৎপল দত্ত, শর্মিলা ঠাকুর এবং অনিল চট্টোপাধ্যায়কে এনে শুটিং করা অসম্ভব। সঙ্গে ছিলেন লেখক শক্তিপদ রাজগুরু। নদীর ধারে বাংলোয় ছিলেন তাঁরা। মশাদের গান শুনে রাতভোর ঘুমোতে পারেননি শক্তিপদ। ভোরের দিকে যখন দু’চোখের পাতা বুজে আসছিল, তখন জানলা দিয়ে সন্দেশখালির রামপুরা নদীর রূপ দেখে তিনি শক্তি সামন্তকে টেনে তুলে বারান্দায় নিয়ে যান। বাইরের দৃশ্য দেখে সে দিন শক্তি সামন্ত নাকি বলে উঠেছিলেন, ‘এ কী দেখছি আমি! প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্য আগে কখনও দেখিনি।’ সূর্যোদয়ের রঙে সে দিন লাল হয়ে উঠেছিল আকাশ, নদী। রামপুরার উপরে পাল তোলা নৌকা থেকে ভেসে আসছিল মাঝির গলায় ভাটিয়ালি গান। মত বদল করেন শক্তি সামন্ত। শুটিং শুরু হয় সন্দেশখালি–২ ব্লকের ভাঙাতুষখালি গ্রামে। শক্তিপদ রাজগুরুর লেখা ‘নয়া বসত’ উপন্যাসের চিত্ররূপ ‘অমানুষ’।

    কথা হচ্ছিল সন্দেশখালির প্রাক্তন বিধায়ক সুকুমার মাহাত এবং নিরাপদ মাহাতর সঙ্গে। তাঁদের কথায়, উত্তমকুমারকে দেখতে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামের শয়ে শয়ে মানুষ ভিড় জমাতেন। ৭৫–এর পরান মণ্ডল বলেন, ‘মহানায়ককে সামনে দেখতে পেয়ে যে আনন্দ হতো, এক কথায় তা প্রকাশ করা যায় না।’ স্থানীয় বয়স্কদের কথায়, কলকাতার বেলেঘাটার ব্যবসায়ী মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাংলো ছিল ভাঙাতুষখালিতে। শক্তিপদ রাজগুরু ছিলেন তাঁর বন্ধু। দুই বন্ধুতে মাঝেমধ্যে আসতেন গ্রামে। এ ভাবেই সুন্দরবনের পটভূমিতে সৃষ্টি হয় ‘নয়া বসত’।

    শুটিংয়ের জন্য প্রায় ছ’মাস ধরে ভাঙাতুষখালিতে তৈরি হয় ৪০টি কাঠের ঘর। বানানো হয় বাজার, রাধাগোবিন্দের মন্দির, স্কুল, থানা, জমিদার বাড়ি। দু’মাসের উপরে শুটিং হয়। রামপুরা নদীর ধারে শাল গাছের খুঁটি, গোলপাতার ছাউনি দেওয়া কাঠের বাংলোয় থাকতেন মহানায়ক। শিল্পীদের জন্য ‌কলকাতা থেকে রান্নার লোক আনা হয়েছিল। সে বার মহানায়কের ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ কেউ অমানুষ ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন। পরিমল মাঝি, বিন্দুবালাদেবীরা বাঁধ ভাঙার দৃশ্য, বাজারের মধ্যে মারামারির শুটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন। ৩০ টাকা রোজ এবং দু’বেলা খাওয়ার বিনিময়ে সিনেমায় কাজ করেছিলেন কাছারিপাড়ার ফজলুল হক, ময়না দাস। সেই ময়না এখন বৃদ্ধা। বলছেন, ‘উত্তমবাবু সকলের সঙ্গে মিশতেন, কথা বলতেন। একবার বলেছিলাম ছেলেকে একটু ধরবেন? ছবি তুলব। কোনও রকম কুণ্ঠা না করে মহানায়ক ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করেছিলেন।’

    গ্রামবাসীদের কথায়, সকালে নদীর ধার দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতেন আর সুযোগ পেলে নদীর তীরে বসে বই পড়তেন উত্তমকুমার। শুটিং শেষে দুপুরে সকলের সঙ্গে বসে খাওয়ার সময়ে সিনেমার বিষয়ে এমন ভাবে আলোচনা করতেন, যেন তিনি এক জন সাধারণ মানুষ। পরে আনন্দ আশ্রম, ‘জাল সন্ন্যাসী’ ছবির শুটিং করতে আবার সন্দেশখালি এসেছিলেন মহানায়ক।

    কিন্তু, ‘আমানুষ’–এর শুটিংয়ের সময়ে উত্তমকুমারের সঙ্গে গ্রামের সেই যোগ যেন অনন্য। আজও সে গ্রামে বাইরের লোকের পা পড়লে গ্রামের মানুষ বলে ওঠেন, জানেন। এই গ্রামেই ...

  • Link to this news (এই সময়)