যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া আন্দোলন রাজধানীর সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কোণায় কোণায়। একদিকে জেন জ়ি-দের সেই আন্দোলনে ঊর্ধ্বমুখী ঝাঁঝ, অন্যদিকে পড়ুয়াদের স্বার্থরক্ষার দাবিতে অনশনে অনড় শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তার জেরে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি। কেন্দ্রের উপর ক্রমশই বাড়ছিল সাঁড়াশি চাপ। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ব্রেকিং নিউজ়— কেন্দ্রের আশ্বাসে সন্তুষ্ট হয়ে অনশন প্রত্যাহার করলেন ওয়াংচুক। অনশনের ২৬ দিনে গুরুগ্রামের মেদান্ত হাসপাতালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার হাত থেকে স্যুপ খেয়ে অনশন ভাঙলেন তিনি। কিন্তু কী ভাবে সোনমকে রাজি করাল কেন্দ্র? তার নেপথ্যে রয়েছে ৪৮ ঘণ্টার প্রচেষ্টা ও চার ঘণ্টার ব্রেনস্টর্মিং এক বৈঠক।
ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারে রাজি করানো সহজ ছিল না। কেন্দ্রের তরফে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে চলেছে কৌশলী আলোচনা। সবশেষে শর্ত মাফিক একাধিক লিখিত আশ্বাসের পরেই গলল বরফ। মঙ্গলবার ও বুধবার মেদান্ত হাসপাতালে গিয়ে একাধিক বার ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। সবশেষে বৃহস্পতিবার কেন্দ্র সরকারের লিখিত আশ্বাস নিয়ে সোনমের মুখোমুখি হন তাঁরা।
সোনম ওয়াংচুকের পক্ষ থেকে কেন্দ্র সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি রাখা হয়েছিল। পড়ুয়াদের আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়তেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং সেই দাবি নিয়ে দীর্ঘ বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠকেই আন্দোলনের দাবিগুলি নিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত হয়। এর পরে জিতেন্দ্র সিং ফোনে ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি অ্যাংমোর সঙ্গে কথা বলেন।
সূত্রের খবর, অনশনরত ওয়াংচুককে বার্তা দেওয়া হয় যে, আন্দোলনকারীদের বিষয়গুলি নিয়ে সরকার আন্তরিকভাবে ভাবছে। তখন অ্যাংমোকে অনুরোধ করা হয়, তিনি যেন সোনমকে অনশন প্রত্যাহার করতে বলেন। তখন খানিক নমনীয় হলেও কোনও সিদ্ধান্ত নেননি ওয়াংচুক। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের অনুরোধে তাঁর দেওয়া শর্ত থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের শর্ত সরিয়ে নেন তিনি। তবে ২০ জুলাইয়ের 'চলো সংসদ' কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা না করার শর্তে জোর দেন ওয়াংচুক।
এর পরেই বৃহস্পতিবার রাতে ফের হাসপাতালে গিয়ে ওয়াংচুকের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। ওয়াংচুকের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে নাড্ডা নিজে কেন্দ্রের আশ্বাসপত্র পড়ে শোনান।
ওয়াংচুককে পাঠানো সেই চিঠিতে কেন্দ্রের দেওয়া মূল আশ্বাসগুলি হলো:
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আইনি সুরক্ষা: যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা আইনি পদক্ষেপ করা হবে না।
ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট ও কঠোর আইন: প্রশ্ন ফাঁস রুখতে এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করতে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠনের রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে, যা ক্যাবিনেটে পেশ করা হবে।
সংসদে আলোচনার সম্মতি: NEET-UG প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সংসদ চলতি অধিবেশনে বিশদ আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কেন্দ্র।
প্রশাসনিক পদক্ষেপ: পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিবকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অনশন ভাঙার পরে সোনম ওয়াংচুক জানান, সরকারের থেকে আশ্বাস পাওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও ধরনের হিংসা বা বিশৃঙ্খলা না ছড়ায়, সেই বিষয়টি বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি সমর্থকদের শান্ত থাকার এবং অহিংস ভাবে আন্দোলন করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, কেবল মৌখিক আশ্বাসে আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসতে চাননি। ফলে গত দুই দিন ধরে কেন্দ্রের সঙ্গে তীব্র দরকষাকষি চলে। অবশেষে সরকারের তরফে সমস্ত প্রতিশ্রুতি লিখিত আকারে তাঁকে দেওয়ার পরে তিনি অনশন ভাঙতে সম্মত হন।
তবে অনশন শেষ হলেও আন্দোলন যে শেষ হচ্ছে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সোনম ওয়াংচুক। পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মূল লড়াই কেবল শুরু হলো। সোনমের স্বাস্থ্যের অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর আগে বিরোধী দলের একাধিক সাংসদ, রাজনৈতিক নেতা ও সেলেবরা অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনাতেই আসে টার্নিং পয়েন্ট। তাতেই নিজের সিদ্ধান্ত বদলান সোনম ওয়াংচুক, মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।
ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র ব্যানারে চলা এই আন্দোলনের প্রধান মুখ ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহার করায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, অনশন ভাঙলেও সরকার লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলো কী ভাবে বাস্তবায়ন করছে, তার উপর কড়া নজর রাখা হবে।
কেন্দ্রের পক্ষ থেকে একাধিক লিখিত আশ্বাস দেওয়ার পর ২৬ দিনের অনশন প্রত্যাহার করতে রাজি হন সোনম ওয়াংচুক।
সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় আলোচনা চলে এবং শেষ পর্যায়ে প্রায় ৪ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক হয়।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং সরাসরি ওয়াংচুকের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন।
না। সোনম ওয়াংচুক এবং আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের উপর নজর রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে।
বড় মোড়: ২৬ দিনের অনশন প্রত্যাহার করলেন সোনম ওয়াংচুক।
নেপথ্যে: প্রায় ৪৮ ঘণ্টার টানা আলোচনা ও ৪ ঘণ্টার বৈঠক।
মূল ভূমিকা: জে.পি. নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উদ্যোগ।
কোথায়: গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে বৈঠক ও অনশন ভঙ্গ।
শর্ত: লিখিত আশ্বাস ছাড়া অনশন ভাঙতে রাজি হননি ওয়াংচুক।
সরকারের আশ্বাস: আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত, সংসদে আলোচনা ও শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত: আন্দোলনের স্বার্থে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের শর্ত থেকে সরে এলেও ছাত্রদের বিরুদ্ধে মামলা না করার দাবিতে অনড় ছিলেন।
ওয়াংচুকের বার্তা: অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
পরবর্তী অধ্যায়: অনশন শেষ হলেও সরকারের লিখিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উপর কড়া নজর রাখবে আন্দোলনকারীরা।