• আমার কারও কাছে কোনও কিছু প্রমাণ করার নেই: সুদীপ
    এই সময় | ২৪ জুলাই ২০২৬
  • এখনও টেলিভিশনের মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসে তাঁর কাছে। টেলিভিশন, সিনেমা, সিরিজ়— অভিনেতা সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়ের তালিকা থেকে বাদ যায়নি কোনও মাধ্যমই। এ বার তাই নতুন করে নিজেকে আবিষ্কারের পালা। ‘যাত্রার হাইওয়ে...’ ধরার অভিজ্ঞতা ভাগ সুদীপের।

    এই সময় অনলাইন: ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ বছরের জার্নি। বড় পর্দা, ছোট পর্দায় দাপুটে অভিনয়ের পরে এ বার যাত্রার জগতে পা রাখা...
    সুদীপ: ২০০৯ সালে আমি প্রথম যাত্রায় অভিনয় করেছিলাম। তার পরে আর সে ভাবে সময় পাইনি। সত্যি বলতে ওই মাধ্যমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু কষ্টই হচ্ছিল। সেটা যদিও স্টেজের উপরে নয়। বরং, স্টেজের বাইরে যে সিস্টেম চলছিল বা যে হাউজ়ের সঙ্গে আমি ছিলাম, সেখানকার কিছু বিষয় আমার পছন্দ হয়নি। এ বছর আমি আবারও মনস্থির করেছি যে, অনেকদিন যেহেতু যাত্রা করা হয়নি, তাই যদি কিছু করা যায়। প্রযোজক তাপস দাস আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খোঁজ নিয়ে জানলাম খুব ভালো মানুষ। তাঁর অনেকগুলো নিজস্ব দল আছে। আর তা ছাড়া আমি তো থিয়েটার করি অনেক বছর। তাই আমার মনে হয়, যাত্রা তো থিয়েটারেরই আরেকটা পার্ট। সেই জন্যই আবারও ফিরে আসা।

    এই সময় অনলাইন: আচমকা ধারাবাহিক ‘চিরসখা’ বন্ধ হয়ে যাওয়াই কি যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্যতম কারণ?
    সুদীপ: এই মুহূর্তে ধারাবাহিক করছি না, ঠিকই। তবে কিছু সিনেমা, ওয়েব সিরিজ়ের কাজ তো চলছেই। নতুন থিয়েটারের রিহার্সাল চলছে। তাই মেগা সিরিয়াল বন্ধের সঙ্গে যাত্রার কোনও সম্পর্কই নেই। তাপসদা উল্টে (যাত্রার প্রযোজক) আমায় বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার মতো সিরিয়াল করো, কোনও সমস্যা নেই। আমি সেই ভাবেই ডেট ফেলব।’ তাই সমস্যা হওয়ার তো কথাই নেই।

    এই সময় অনলাইন: টেলিভিশনে অনেক বেশি সময় দিতে হলেও, নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক মেলে। যাত্রা বা নাটকের ক্ষেত্রে তো একটা অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
    সুদীপ: আমাদের অভিনয় জীবন তো অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। কারণ, আমি যে সময়ে অভিনয় শুরু করেছিলাম, যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছিলাম, তাঁদের মধ্যে অনেককে এখন দেখতেই পাই না। আমি যে কাজ করতে পারছি, তার জন্য ইন্ডাস্ট্রির সকলকে ধন্যবাদ জানাব। প্রতিটা মুহূর্ত নিজেকে প্রমাণ করতে হয়, টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়। শেষ অভিনীত ধারাবাহিকেও (চিরসখা) মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছি, যেটা খুবই পজ়িটিভ। অনেক কাজের অফারও আসছে। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তা নিয়ে চাপ নেই কোনও। হ্যাঁ, সাংসারিক দায়িত্ব তো আছেই। ওঠাপড়াও এসেছে প্রচুর। তবে আমি কখনও থেমে থাকিনি।

    এই সময় অনলাইন: ঠান্ডা ঘরে বেশিরভাগ শুটিং হয় ধারাবাহিকের। সেই জায়গা থেকে মাঠে-ময়দানে গিয়ে অভিনয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছোটাছুটি অনেক বেশি পরিশ্রমের। কী ভাবে মেনটেন করা সম্ভব?
    সুদীপ: একবছরের যাত্রার অভিজ্ঞতায় আমি বলছি, তেমন পরিশ্রম আমি উপলব্ধি করিনি। মোটামুটি তিন ঘণ্টার হয়ে গিয়েছে যাত্রার ডিউরেশন। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়ার যে সময়টা লাগে, সেটা নিয়েই মূলত আলোচনা হয়। এখন তো ২০০৯-এর থেকে রাস্তাঘাট অনেক ভালো হয়েছে। সেখানে গিয়ে একটা অথবা দুটো জায়গায় শো হতে থাকে। কাছাকাছি দু’টো জায়গায় যদি শো থাকে, তাহলেও তিন ঘণ্টার যাত্রা অর্গানাইজ় করাটা সমস্যার নয়। এ বার যদি জেলা থেকে কলকাতায় ট্রাভেল করে আবার একটা শো করতে হয়, তা হলে সমস্যা হতে পারে। একটা জার্নি তো হয়, যেটা কষ্টের। আর স্টেজ পারফর্ম্যান্সের ক্ষেত্রে পরিশ্রম বেশি করতে হয়। না হলে তো ভালোও লাগে না।

    এই সময় অনলাইন: এখনও প্রথম সারির বিনোদন মাধ্যমের তালিকা থেকে দূরেই রাখা হয় যাত্রাকে। আপনাদের মতো তারকা যখন এগিয়ে আসছেন, তখন পরিকাঠামোগত ভাবেও কি আরও কোনও নতুন পথ খুলবে?
    সুদীপ: আসলে একটা বিষয় বলি, আমরা তো খুব সামান্য অভিনেতা। অনেক বড় বড় অভিনেতারা যাত্রা করেছেন দীর্ঘ বছর। সুতরাং, যাত্রার স্টারডম নিয়ে কোনও প্রশ্ন হবে না। আমাদের দেশে এখনও বিশেষ করে গ্রামবাংলায় যেখানে যাত্রার মূল দর্শক, সেখানে এখনও এই শিল্পকে পিছিয়ে রাখা হয়। সিনেমার বিষয়টাও ঠিক তেমনই। শহরে বসে আমরা যে পরিকাঠামো পাচ্ছি, গ্রামেগঞ্জে কি সেই একই সুবিধা পাচ্ছে দর্শক?

    এই সময় অনলাইন: জেলার বিভিন্ন প্রান্তে যখন যাত্রার জন্য যেতে হয়, তখন আরও সিনেমাহল সেখানে নেই কেন বা কবে তৈরি হবে, এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হন?
    সুদীপ: আমায় সরাসরি কখনও এই প্রশ্ন কেউ করেনি। তবে গ্রামে যে মাচার অনুষ্ঠান হয়, এর মধ্যে একটা সুপ্ত অপমান করার প্রবণতা রয়েছে। কেউই বলে না যে, গ্রামের অনুষ্ঠান বা কাঠের মঞ্চের অনুষ্ঠান। পরিবর্তে ‘মাচা’ বলে উল্লেখ করা হয়। সত্যি বলতে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সিরিয়াল, সিনেমা করে যত টাকা উপার্জন করেন তারকারা, মাচার অনুষ্ঠানে তার থেকে অনেক বেশি উপার্জন করেন অনেকেই। কত কিংবদন্তি জুড়ে থেকেছেন যাত্রার সঙ্গে। অথচ, আমার ব্যক্তিগত মতামত, যেহেতু এটা মূলত গ্রামীণ, যাত্রাকে কিন্তু সেই সম্মানটা দেওয়া হয় না।

    এই সময় অনলাইন: সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনাকে ট্রোলড হতে হয়েছে নানা কারণে, যাত্রার ভিডিয়ো ভাইরাল হলে শুনতে হতে পারে কাজ নেই হাতে, তাই যাত্রা করতে হচ্ছে।
    সুদীপ: কে কী বলছে, সেটা নিয়ে সত্যিই আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তেমন কোনও পোস্ট নেই। আর আমার তো দর্শক ছাড়া কারও কাছে কোনও কিছু প্রমাণ করার নেই।

    এই সময় অনলাইন: ছেলেরা (সুদীপের দুই ছেলেই স্কুলে পড়ে) দেখে আপনার অভিনয়?
    সুদীপ: এখনও আসলে ওরা খুবই ছোট। এই ব্যাপারটায় খুব একটা আগ্রহ নেই। পড়াশোনা, খেলাধূলা, কার্টুন... এগুলো নিয়েই থাকে।

    এই সময় অনলাইন: অপেক্ষাকৃত অনিশ্চিত এই পেশায় তাঁদের কেউ আসুক, বাবা হিসেবে আপনি কি চাইবেন?
    সুদীপ: রামকৃষ্ণদেব বলেছেন, ‘পাখির মতো হও।’ ব্যক্তিগত ভাবে তাই আমি নিজেকে কিছুটা পাখির মতো তৈরি করেছি। বিশ্বাসই করি না, আমার ছেলেদের ভবিষ্যতের জন্য সাংঘাতিক কিছু করে যাব। এখন ওরা ছোট। প্রতি মুহূর্তে আমি পাশে আছি। একবারও বলি না, তোরা সাংঘাতিক ভালো নম্বর তোল। কোনও দিন মনে পড়ে না, স্কুলের মধ্যে কোনও দিন ওদের মার্কশিট খুলে দেখেছি। আমার বিশ্বাস ওরা পারবে। তাদের জন্য বিরাট কিছু হয়তো আমি রেখেও যেতে পারব না। তবু ওদের জীবন ঠিক ওরা গুছিয়ে নেবে বলেই আমার বিশ্বাস।
  • Link to this news (এই সময়)