• মিছিল শেষে অশান্তি কলকাতায়, ‘ককরোচ’–এর নামে ভিড়ে মিশে তাণ্ডব বহিরাগতের?
    এই সময় | ২৫ জুলাই ২০২৬
  • এই সময়: দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে প্রতিবাদের ঢেউ আগেই ছড়িয়েছিল মুম্বই, পাটনায়। ‘ককরোচ’দের সমর্থনে প্রতিবাদে শুক্রবার উত্তাল হলো কলকাতার প্রাণকেন্দ্র। তবে মিছিল শান্তিপূর্ণ ভাবে মিটলেও দিনের শেষে তাল কাটল বিক্ষোভকারীদের একাংশের মারমুখী হয়ে ওঠার জেরে। পুলিশ কোথাও প্রতিবাদীদের মিছিলকে আটকায়নি। ধর্মতলায় মিছিল পৌঁছলে আরও বিভিন্ন দিক থেকে অনেকে এসে জড়ো হন সেখানে। প্রতিবাদীদের ভিড়ে মিশে থাকা কয়েকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল, জুতো ছোড়ে বলে অভিযোগ। তার পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

    ‘নিট’ প্রশ্নফাঁসের জেরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ডাকে দিল্লিতে অবস্থান–বিক্ষোভ চলছে প্রায় এক মাস ধরে। শুক্রবার সিজেপি–র তরফে কলকাতাতেও জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তবে এ দিন সকাল পর্যন্ত পুলিশের অনুমতি না–মেলায় তাদের তরফে ভিডিয়ো বার্তায় জানানো হয়, তারা মিছিলের ডাক প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। সিজেপি–র কেউ আগ্রহী হলে তিনি বাম ছাত্র–যুব সংগঠনগুলির মিছিলে অংশ নিতে পারেন। এসএফআই, ডিওয়াইএফআই, ডিএসও, আইসা–র মতো বাম ছাত্র–যুব সংগঠনগুলির তরফে আগেই দিল্লির প্রতিবাদীদের সমর্থনে এ দিন শিয়ালদহ থেকে মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছিল।

    মূলত বাম সংগঠনগুলি জমায়েতের ডাক দিলেও এ দিন বেলা আড়াইটে নাগাদ শিয়ালদহ থেকে শুরু হওয়া মিছিলে বহু সাধারণ ছাত্রছাত্রী, তাঁদের অভিভাবক, বিভিন্ন আন্দোলনের পরিচিত মুখেরা সেখানে জড়ো হন। বিকেল তিনটের পরে মিছিল শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলার উদ্দেশে রওনা হয়। শুধু এসএন ব্যানার্জি রোড পেরোতেই পুরো মিছিলের সময় লাগে দেড় ঘণ্টার বেশি। মিছিল ধর্মতলায় পৌঁছনোর পরে আশপাশ থেকে আরও অনেকে সেখানে জড়ো হন। অভিযোগ, সেই সময়েই পুলিশের সঙ্গে বচসা শুরু হয় আন্দোলনকারীদের একাংশের। পুলিশকে লক্ষ্য করে জলের বোতল, জুতো, কাগজ ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও তখন লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করে। পুলিশ অবশ্য লাঠিচার্জের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই বিক্ষোভ মিছিলের জেরে এ দিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মধ্য কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

    এ দিনের এই মিছিলে কোনও দলাদলি ছিল না। বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের পাশাপাশি সাধারণ পড়ুয়াদেরও অনেকে কেউ গলায় আই কার্ড ঝুলিয়ে, কেউ মুখে মাস্ক বা রুমাল বেঁধে মিছিলে পা মেলান। অনেকের হাতে ছিল বিভিন্ন দাবি সম্বলিত পোস্টার। কেউ আবার নিজের ক্লাসের নোটবুকেই ডট পেন দিয়ে পোস্টার লিখে মিছিলে পা মেলান। স্পাইডার ম্যান, ব্যাটম্যান, মিস্টার অ্যানোনিমাসের মুখোশ পরেও বহু আন্দোলনকারীকে মিছিলে হাঁটতে দেখা যায়। কেউ কেউ ছিলেন আরশোলার সাজেও। তাঁদের একটাই দাবি— ‘নিট’ প্রশ্নফাঁসের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে।

    মধ্যমগ্রাম থেকে মিছিলে েযাগ দিতে এসেছিলেন রোশনি মিত্র। তাঁর কথায়, ‘চাকরি নেই, প্রশ্ন ফাঁস— আমরা এমনটা চাই না। তাই মিছিলে এসেছি।’ আশুতোষ কলেজের ছাত্রী অনুষ্কা ঘোষের কথায়, ‘এই বিক্ষোভ যন্তর মন্তরে চলতে থাকা ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতেই। আমরা চাই, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করুন। আন্দোলনকারীরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা চেয়েছিলেন। বদলে দিল্লি পুলিশ তাঁদের উপরে নির্মম লাঠিচার্জ করেছে। এর প্রতিবাদেই পথে হাঁটছি আমরা।’ অনেক অভিভাবককেও এই মিছিলে অংশ নিতে দেখা গিয়েছে। যেমন— লামিয়া ফিরদৌসি তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে মিছিলে হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার দুই সন্তান এখন বড় হয়ে গিয়েছে। তবু আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আমি রাস্তায় নেমেছি।’ এ দিন শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক–সহ বিভিন্ন পেশার মানুষও অংশ নিয়েছিলেন মিছিলে।

    এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও উত্তেজনা না–ছড়ায়, তার জন্য বড় পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত। সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের নেতৃত্বে র‌্যাফ, রোবোকপও মোতায়েন করা হয়েছিল। ছিল জলকামানও। কোথাও জমায়েত বা মিছিলকে বাধা দেয়নি পুলিশ। গোলমাল শুরু হয় বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ মিছিলের বড় অংশ ধর্মতলায় পৌঁছনোর পরে। অভিযোগ, সেখানে মিছিল পৌঁছনোর পরে বিভিন্ন দিক থেকে আসা আরও অনেকে ভিড়ে যান প্রতিবাদীদের ভিড়ে। তারপরেই নিজেদের আন্দোলনকারী বলে পরিচয় দেওয়া কয়েকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে কটূক্তি, গালিগালাজ করতে থাকেন। জুতো, জলের বোতলও ছোড়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ থেকেই প্রথমে ধাক্কাধাক্কি, পরে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়। বেশ কয়েকজন সাংবাদিককেও নিগৃহীত হতে হয়। এই অশান্তির নেপথ্যে বহিরাগতদের হাত দেখছেন প্রতিবাদীদের অনেকে। এসএফআইয়ের তরফে শুভজিৎ সরকারের দাবি, ‘আমাদের মধ্যে কেউ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছোড়েনি। আন্দোলন ভেস্তে দিতে কিছু বহিরাগত এই ঘটনা ঘটিয়েছে।’



    কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (১) দেবেন্দ্রপ্রকাশ সিং বলেন, ‘আমরা ওঁদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ যেন শান্তিপূর্ণই থাকে, আমরা সেই চেষ্টাই করেছি।’ এ দিন জমায়েত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লালবাজারের তরফে ফোর্সও বাড়ানো হয়। পাঠানো হয় অন্য সিনিয়র অফিসারদেরও। পর্যপ্ত সংখ্যায় মহিলা পুলিশকর্মীও মোতায়েন করা হয়। শেষে দেবেন্দ্রপ্রকাশ–সহ পুলিশকর্তাদের আলোচনার পরে আন্দোলনকারীরা রানি রাসমণিতে অবস্থানে বসতে রাজি হন তাঁরা। রাত ন’টা নাগাদ সেই জমায়েত তুলে নেওয়া হয়।

  • Link to this news (এই সময়)