• ‘মিত্রো’ থেকে ‘ফ্রেন্ডস’: জ়েনজ়ি-কে বার্তা নাকি মোদীর রাজনৈতিক যোগাযোগের প্যারাডাইম শিফট?
    এই সময় | ২৫ জুলাই ২০২৬
  • ‘মিত্রো’ থেকে ‘ফ্রেন্ডস’। রাত ৮টার টেলিভিশন ভাষণ থেকে মধ্যরাতের সেলফি-লাইভ। রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিধানে কি নতুন প্যারাডাইম শিফটের ইঙ্গিত মিলছে? নাকি জ়েনজ়ি-র ডিজিটাল দুনিয়ায় ‘তাঁদেরই একজন’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী? বোঝাতে চাইছেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক।’ পরপর দু’দিন (বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার) তাঁর লাইভ বার্তা ঘিরে চলছে সেই জল্পনাই।

    ২০১৬-র নোটবন্দির ঘোষণা হোক কিংবা কোভিড-১৯ অতিমারির সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ — সবটাই ছিল স্টুডিওর নিখুঁত আলোয় সাজানো। গম্ভীর আবহ, সংযত কন্ঠে। কোটি কোটি ভারতীয় টেলিভিশনের সামনে স্তব্ধ হয়ে তাঁর ভাষণ শুনেছেন। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। বদলে গিয়েছে অভ্যাস, এমনকী সংবাদ পরিবেশনের কৌশলও।

    আজকের জ়েনজ়ি রাত ৮টার অপেক্ষায় বসে থাকার পাত্র নয়। তাদের পৃথিবী গড়ে ওঠে মোবাইলের পর্দায়—১৫ সেকেন্ডের ভিডিও, দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্য, আর অ্যালগরিদমের হাতে সাজানো অন্তহীন সোশ্যাল মিডিয়া ফিডে।

    সেই পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই যেন বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৫২ মিনিটে একটি সেলফি ভিডিয়ো পোস্ট করলেন মোদী। স্টুডিওর ক্যামেরার বদলে হাতের স্মার্টফোনের দিকে তাকিয়ে শুরু করলেন ভাষণ। নিজের চেনা ছন্দ থেকে বেরিয়ে যুবসমাজকে সম্বোধন করলেন ‘ফ্রেন্ডস’ বলে। যেন তিনি মঞ্চে নয়, হাতের মুঠোয় পর্দার ওপারেই রয়েছেন। ডিজিটাল যুগের আন্দোলনের কথা ভেবেই যেন এই পরিবর্তন। একেবারে মাপা এবং মানানসই।

    মোদী আশ্বাস দিলেন নিটের প্রশ্নফাঁস রুখতে খসড়া বিল তৈরি করা হয়েছে। সেই নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হবে। মুহূর্তের মধ্যে সেই ভিডিয়ো শুধু ভাইরাল হলো না, দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সব রেকর্ড ভেঙে ২৪ ঘন্টায় ৩৫২ মিলিয়ন ভিউ। পিছনে ফেলে দিলেন BTS-কেও। পরের দিন শুক্রবার ধন্যবাদ জানিয়ে আরও একটি ভিডিয়ো পোস্ট করলেন তিনি। সেই ফ্রেন্ডস সম্বোধন। আড্ডা দেওয়ার কায়দায় পৌঁছে দিলেন জরুরি কথাটাও।

    অ্যালগরিদমের লড়াই: যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলনের মতো জ়েনজ়ি বিক্ষোভে ছোট ভিডিও বা রিলস, ট্রেন্ডিং অডিও, ভাইরাল মিম এবং দ্রুত আপডেটই মূল হাতিয়ার।

    ব্যক্তিগত সংযোগের অনুভূতি: মোবাইলের ভিডিয়ো অনেকটা ব্যক্তিগত ভিডিও কলের মতো। দর্শকের কাছে অনেক বেশি স্বাভাবিক। অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

    সময়: ভিডিয়ো পোস্ট করলেন মাঝরাতে। কারণ, তরুণদের বড় অংশ ওই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘অ্যাকটিভ’ থাকে। সকালে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের আগেই ওই ভিডিও বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।

    অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি নিছক পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়; বরং সরকারি যোগাযোগের ধরনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। মন্ত্রিসভার বৈঠকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদেরও ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় হওয়ার বার্তা দিয়েছেন মোদী। পরামর্শ দিয়েছেন রিলস বানানোর। বুঝিয়ে দিয়েছেন, তরুণদের ভাষায় তরুণদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি সেলফি ভিডিয়ো কি সংসদের দীর্ঘ বিতর্কের বিকল্প হতে পারে? সরকারি মঞ্চে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কি কয়েক মিনিটের রিলসের গুরুত্ব বহন করে? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর লিখবে আগামী দিনের গণতন্ত্র।

    কারণ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দীর্ঘদিন ধরে ‘মিত্রো’ সম্বোধন ব্যবহার করলেও সাম্প্রতিক সেলফি-ভিডিয়োয় ‘ফ্রেন্ডস’ বলে সম্বোধন করেছেন। অনেকের মতে, এটি তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন কৌশল।

    কারণ, প্রচলিত টেলিভিশন ভাষণের বদলে মোবাইল-কেন্দ্রিক, সোশ্যাল মিডিয়ার উপযোগী এবং অ্যালগরিদম-ভিত্তিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।

    জেন জি মূলত ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব শর্টস, রিলস ও স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিওর মাধ্যমে তথ্য গ্রহণ করে। তাই রাজনৈতিক বার্তাও সেই মাধ্যমেই পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

    তিনি NEET প্রশ্নফাঁস রুখতে একটি খসড়া বিল তৈরির কথা জানান এবং বলেন, তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হবে।

    ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রাতের দিকে তরুণ ব্যবহারকারীদের সক্রিয়তা বেশি থাকে। তাই ওই সময়ে পোস্ট করলে ভিডিও দ্রুত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে।

    প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্ত্রীদের ইনস্টাগ্রামে আরও সক্রিয় হতে, রিলস তৈরি করতে এবং তরুণদের ভাষায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

    সমালোচকদের প্রশ্ন, সোশ্যাল মিডিয়ার ছোট ভিডিও কি সংসদীয় বিতর্ক, সংবাদ সম্মেলন বা আনুষ্ঠানিক সরকারি যোগাযোগের বিকল্প হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক যোগাযোগের দিশা নির্ধারণ করতে পারে।

  • Link to this news (এই সময়)