• ‘সাকি’–র পরে নিলামে ‘শ্যাডো’, হেমেন মজুমদারের ছবির বিডিং প্রাইস ১ কোটি ২৫ লক্ষ
    এই সময় | ২৫ জুলাই ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুনের পরে অগস্ট। মাত্র দু’মাসের মাথায় ফের দেশের শিল্পরসিকদের আলোচনায় বাংলার হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার। জুনে প্রখ্যাত নিলাম সংস্থা ‘অষ্টগুরু’ নিলামে তুলেছিল হেমেন মজুমদারের ‘সাকি’ ছবিটি। তার দু’মাসের মাথায় ফের নিলামে উঠতে চলেছে ১৯২৭ সালে আঁকা শিল্পীর জলরঙের ছবি ‘শ্যাডো’। ১২ অগস্ট ‘অষ্টগুরু’ যে নিলামের আয়োজন করতে চলেছে, সেখানেই ‘লট এইট’ হিসেবে রাখা হয়েছে এই ছবিটি। সংস্থা জানিয়েছে, ছবিটির বিডিং প্রাইস এক কোটি ২৫ লক্ষ টাকা ধার্য করা হয়েছে। অর্থাৎ ছবিটির ডাক শুরুই হবে ওই বিপুল মূল্যে। আশা করা হচ্ছে নিলামে ছবিটি দু’কোটি টাকায় বিক্রি হতে পারে।

    এই ছবিতে একটি মাত্র চরিত্র। তিনি এক তরুণী। পাশে কলসি নিয়ে সেই তরুণীকে একাকী পুকুরের পাশে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তবে, ছবিটির মূল আকর্ষণ ওই নারীমূর্তি নয়, বরং তার শরীরের উপরে আলো–ছায়ার খেলা। শেষ বিকেলের মৃদু আলো তাঁর শরীরের কিছুটা অংশকে উজ্জ্বল করে তুলেছে, অন্য অংশ ছায়ায় ঢাকা। এই আলোকবিন্যাস ছবিতে এক ধরনের রহস্যময় আবহ সৃষ্টি করে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, হেমেন মজুমদার এমন আলোছায়ার রহস্যময় আবহ তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি মানুষের শরীরের গঠন, ত্বকের রং, কাপড়ের ভাঁজ এবং আলোর প্রতিফলন এমন নিখুঁত ভাবে আঁকতেন, যে তাঁর অনেক ছবি প্রথম দর্শনে আলোকচিত্র বলে মনে হয়। তাঁর শিল্পশৈলী ইউরোপীয় ‘অ্যাকাডেমিক রিয়েলিজ়ম’–এর গভীর প্রভাব বহন করে। একই সঙ্গে ইতালীয় ‘কিয়ারোস্কিউরো’ অর্থাৎ আলো-ছায়ার বৈপরীত্য কৌশলের প্রভাবও তাঁর ছবিতে অত্যন্ত স্পষ্ট। ‘শ্যাডো’ ছবিটি এই দুই ধারারই সফল প্রয়োগ।

    ১৭.৫ ইঞ্চি দীর্ঘ এবং ১৩ ইঞ্চি প্রস্থ এই ছবিটিতে শিল্পীর হস্তাক্ষর দেখা যাবে ছবির ডান পাশে একেবারে নীচের দিকে। প্রমেশ সোম ও সিপি রায়ের ‘দ্য আর্ট অফ মিঃ হেমেন মজুমদার’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে এবং শিল্পীর পরিবারেরই সদস্য ও শিল্প ইতিহাসবিদ অনুরাধা ঘোষের লেখা ‘হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার’ বইতে এই ছবিটির বিশেষ উল্লেখ আছে। অনুরাধা বলেন, ‘অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে যে নিও বেঙ্গল স্কুল তৈরি হয়েছিল, হেমেন মজুমদার, অতুল বসু এবং যামিনী রায়ের মতো শিল্পীরা সেই স্কুলের দর্শন মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ আর্ট তৈরি করেন। হেমেন মজুমদারের ছবিতে রঙের ব্যবহার, তুলির টান এবং টোনাল এফেক্টে ইউরোপীয় শিল্পীদের প্রভাব খুব বেশি।’

    ১৯২৮ সালে শিল্পীর আঁকা একটি অনামী ছবি মুম্বইয়ের একটি নিলামে পাঁচ কোটি চার লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এটাই ভারতের কোনও নিলামঘরে হেমেন মজুমদারের সবচেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি হওয়া ছবি। এ ছাড়া তাঁর ‘রাধা ও কৃষ্ণ’ নামের ছবিটি তিন কোটি ৭০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম সফল এই বাঙালি বাস্তবধর্মী চিত্রশিল্পীর আঁকা নারী-প্রতিকৃতি, বিশেষ করে ভেজা শাড়ি পরা নারীর চিত্র, ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে নিয়েছে। সম্প্রতি তাঁর বেশ কয়েকটি ছবি আন্তর্জাতিক নিলামে কোটি টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি হয়েছে, যা তাঁর শিল্পকর্মের ক্রমবর্ধমান মূল্য ও গুরুত্বের প্রমাণ। আশা করা হচ্ছে, তাঁর ‘শ্যাডো’ ছবিটিও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ রাখবে।

  • Link to this news (এই সময়)