• জেন জ়ি-রাও পারে, দেশে নতুন ইতিহাস গড়ল ‘ককরোচ’রা, কী ভাবে সফল দু’মাসের সংগ্রাম?
    এই সময় | ২৬ জুলাই ২০২৬
  • অন্ধকার আবর্জনাময় এলাকায় বাস। জীববিজ্ঞানের ভাষায়, ক্ষতিকর তেলাপোকার একটি জাত। আদতে মেরুদণ্ডহীন সন্ধিপদী এক পতঙ্গ। গোটা পৃথিবী জুড়ে যে কোনও বায়ুমণ্ডলেই বেড়ে ওঠে আরশোলা। ইংরেজি নাম ‘ককরোচ’। দেশের প্রথম জেনারেশন জুমার্স বা জেন জ়ি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে গেল সেই ককরোচের নাম। মাত্র দুই মাস বয়সি এক সংগঠনের আন্দোলনের ফল দেশের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। ভারতের ইতিহাসে যা বিরল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

    বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলার মহারণ শুরু হয়েছিল ৪৮টি দেশকে নিয়ে। নিজেদের স্কিল ও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাপ জিতে নিয়েছে মহাতারকাহীন একটি দল, স্পেন। সেই স্পেনের ভাষা ‘cucaracha’ থেকেই উৎপত্তি হয়েছে ইংরেজি শব্দ ‘ককরোচ’-এর। গত ৬ জুন কালো জ্যাকেট, কালো টুপি, কানে হেডফোন আর হাতে আম্বেদকরের আত্মজীবনী নিয়ে বের হওয়া ছেলেটা যখন ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলেন, সেই দিন কেউই ভাবতেই পারেননি গোটা দেশের যুব সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন তিনি। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রাজধানীর বুকে দাঁড়িয়ে তাঁর আন্দোলন সফলও হবে।

    তবে ভারতের যুব সম্প্রদায়ের একাংশের সঙ্গে ‘ককরোচ’ শব্দটি জুড়ে যাওয়ার সূত্র লুকিয়ে ছিল দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, ‘এমন কিছু তরুণ রয়েছে— যাঁদের অনেকটা তেলাপোকার (ককরোচ) সঙ্গে তুলনা করা যায়। যাঁরা কোনও চাকরি পান না এবং পেশাগত ক্ষেত্রেও তাঁদের কোনও স্থান নেই। তাঁদের কেউ কেউ যখন মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, আরটিআই (RTI) কর্মী কিংবা অন্য কোনও ধরনের আন্দোলনকারী হয়ে ওঠে এবং তখন তাঁরা নির্বিচারে সবার উপরে আক্রমণ চালাতে শুরু করেন।’

    দেশের যুব সম্প্রদায়কে উদ্দেশ করে এই মন্তব্যের বিরোধিতা করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র পথচলা শুরু। পরে দেশের প্রধান বিচারপতি পরে ব্যাখ্যা দেন, তিনি গোটা যুব সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এই মন্তব্য করেননি। আইনের যে সব পড়ুয়া ‘ফেক ডিগ্রি’ ব্যবহার করে, তাঁদের প্রতি তাঁর এই মন্তব্য। কিন্তু ততদিনে ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালা হয়ে গিয়েছে।

    ১৬ মে বস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট অভিজিৎ দীপকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশের সবথেকে বড় রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ নাম অনুসারে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম শুরু করেন। সেটা ছিল পুরোটাই ব্যাঙ্গাত্মক। পুরোটাই সমাজমাধ্যম নির্ভর। ‘আমরা অলস’, ‘আমরা কর্মহীন’— এই ধরনের স্লোগান ছড়ানো হয় সেই প্ল্যাটফর্ম থেকে। সবটাই যেন ‘ছেলেখেলার ছলে…’ ।

    নিজেদের বার্তা দিতে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স হ্যান্ডলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে প্রোফাইল তৈরি হয়। AI প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন অভিজিৎ। কর্মহীন যুব সম্প্রদায়কে সেই ওয়েবসাইটে একটি গুগল ফর্ম পূরণের সুযোগ করে দেওয়া হয় সমর্থন জানানোর জন্য। অল্প সময়ের মধ্যেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলের ফলোয়াড় সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যায়। সেই সময়ে বিজেপির অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম ফলোয়াড় ছিল ৮.৭ মিলিয়ন অর্থাৎ ৮৭ লক্ষ। চাকা ঘুরতে শুরু করে এখান থেকেই।

    সমাজমাধ্যমে চলা এই ‘সার্কাস্টিক মুভমেন্ট’-এর পালে হাওয়া লাগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র এক্স হ্যান্ডল বন্ধ করার পরে। ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট, ২০০০ অনুযায়ী সেকশন ৬৯(এ) ধারায় জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের এক্স হ্যান্ডল বন্ধ করা হয়। ৭ জুলাই আদালতের নির্দেশ ককরোচদের এক্স হ্যান্ডল ফের চালু হয়।

    গত ৬ জুন বস্টন থেকে ভারতে ফেরেন অভিজিৎ। সর্বভারতীয় মেডিক্যাল এন্ট্রান্স টেস্ট বা NEET-এ প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সেই কারণে একাধিক পড়ুয়ার আত্মহত্যার ঘটনার প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন দীপকে। অভিজিতের সঙ্গে সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা, বৈষ্ণবী গওর, আফরিন নাওয়াজ, দীপক বালিয়ান, রত্না সিং–সহ একাধিক যুব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র এই আন্দোলনে সামিল হন। শুরু হয় নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনার বিরুদ্ধে আন্দোলন। ২৮ জুন এই আন্দোলনে সামিল হন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। বাড়তি মাত্রা পায় ককরোচদের আন্দোলন। অনশন মঞ্চ থেকে সোনমকে তুলে নেওয়ার পর থেকেই আন্দোলনের তীব্রতা বাড়াতে শুরু করেন পড়ুয়ারা। ২৩ জুলাই মধ্যরাতে অনশন প্রত্যাহার করেন সোনম।

    এর মাঝেই ২০ জুলাই ‘চলো সাংসদ’ অভিযান শুরু করে ককরোচ পার্টি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পড়ুয়ারা এই আন্দোলনে সামিল হন। সেই অভিযানেই পুলিশের বিরুদ্ধে অতিসক্রিয়তার অভিযোগ তোলা হয়। বেধড়ক লাঠিচার্জ করা হয়, কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করা হয়। এমনকী, পেলেট গান ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ। পুরুষ ও মহিলা পড়ুয়াদের সঙ্গে হওয়া ‘বর্বরতা’র নিন্দা শুরু হয় গোটা দেশ জুড়ে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ সূত্র জানায়, প্রায় ৬০ জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। সেই দিন সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ শুধুমাত্র রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালেই বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য মিলিয়ে ৬৫টি মেডিকো-লিগাল কেস (আইনি প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত চিকিৎসা সংক্রান্ত ঘটনা) নথিভুক্ত করা হয়।

    গুটি কয়েক যুব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিকে নিয়ে শুরু হওয়া যন্তর মন্তরের আন্দোলনের আঁচ ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে। পাটনা, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, পুনে— সব মিলিয়ে দেশের ৩৪টি শহরে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। একের পর এক শিক্ষাবিদ, সেলিব্রিটি, সমাজকর্মীরা পড়ুয়াদের এই আন্দোলনের সমর্থনে হাজির হতে শুরু করেন যন্তর মন্তরে।

    ১) কেন্দ্রীয় শিক্ষমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ

    ২) আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়ার মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে তাঁদের বিরুদ্ধে যাতে কোনও আইনি পদক্ষেপ না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে

    ৩) নিটের প্রশ্ন ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পরে যে ক’জন পড়ুয়া আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবার পিছু এক কোটি টাকা করে আর্থিক সাহায্য দিতে হবে

    শনিবার, ২৫ জুলাই দুপুরে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। ককরোচদের বাকি দু’টি দাবিও মেনে নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিদের বৈঠকে।

    ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় কৃষক-শ্রমিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের ঢোকানো হয়েছিল ‘যন্তর মন্তর’ ঘরে। মগজধোলাই হয় তাঁদের। সেই ঘরে ঢোকানো যায়নি উদয়ন পন্ডিতকে। ঢোকানো যায়নি পড়ুয়াদেরও। দড়ি ধরে টান মেরেছিলেন তাঁরাই। দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলে আন্দোলনে বসেছিল দেশের পড়ুয়ারা। যাঁদের হাত ধরার কেউ ছিল না, তাঁরাই আজ আকাশের দিকে তুলে ধরলেন মুষ্টিবদ্ধ হাত। মেলে ধরলেন জয়ের নিশান। সত্যের পথে হাঁটলে কোনও প্রভাবশালীর সাহায্য, কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যাকআপ প্রয়োজন হয় না, তা দেখিয়ে দিলেন পড়ুয়ারা। দেখিয়ে দিলেন ককরোচরা। দেশের ইতিহাসে এক ‘ব্যতিক্রমী’ অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে এই দুই মাসের সংগ্রাম।

    প্রশ্ন: ককরোচ জনতা পার্টি কী?

    উত্তর: এটি প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যের প্রতিবাদে তৈরি হওয়া একটি ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক মাধ্যম-ভিত্তিক আন্দোলন, যা পরে নিট প্রশ্নফাঁস-বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়।

    প্রশ্ন: এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কে ছিলেন?

    উত্তর: বস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র অভিজিৎ দীপক এই আন্দোলনের সূচনা করেন এবং তাঁর সঙ্গে সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কাসহ একাধিক তরুণ প্রতিনিধি যুক্ত হন।

    প্রশ্ন: শিক্ষামন্ত্রী কেন পদত্যাগ করলেন?

    উত্তর: নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে যন্তর মন্তরে টানা আন্দোলন এবং তার ফলে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চাপের মুখে ২৫ জুলাই পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

    প্রশ্ন: সোনম ওয়াংচুকের ভূমিকা কী ছিল?

    উত্তর: ২৮ জুন তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনশন শুরু করেন, যা আন্দোলনকে বাড়তি গতি দেয়। ২৩ জুলাই মধ্যরাতে তিনি অনশন প্রত্যাহার করেন।

    প্রশ্ন: ‘চলো সাংসদ’ অভিযানে কী হয়েছিল?

    উত্তর: ২০ জুলাইয়ের এই অভিযানে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিসক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে এবং লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগে প্রায় ৬০ জন আন্দোলনকারী আহত হন।

  • Link to this news (এই সময়)