শনিবার রাজ্য বিধানসভায় পঞ্চায়েত সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনা ঘিরে শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ হয়। বিজেপি, আইএসএফ ও বিরোধী বিধায়করা বিলের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, অন্যদিকে পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সংশোধনীর পক্ষে সওয়াল করেন।
জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, গত ১৫ বছরে অংশগ্রহণমূলক পঞ্চায়েতের পরিবর্তে ‘বংশগ্রহণমূলক’ পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। তাঁর অভিযোগ, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তৃণমূল সরকারই ভেঙেছে, তাই সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি দাবি করেন, ডেবরা পঞ্চায়েত সমিতিতে বিজেপি জয়ী হওয়ার পরও পাঁচ বছর বোর্ড গঠন করতে দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর বহু গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ করতে দেওয়া হয়নি এবং প্রশাসক বসানো হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, সেই অভিজ্ঞতার কারণেই বর্তমান সংশোধনী আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বহু পঞ্চায়েত প্রধান ও সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন না, ফলে মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দিতে এই পরিবর্তন জরুরি। আগামী দেড়-দু’বছরের মধ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ততদিন কার্যকর প্রশাসন নিশ্চিত করতেই এই সংশোধনী প্রয়োজন।
জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, এই আইন গণতান্ত্রিক কাঠামো ভাঙার জন্য নয়, বরং সাময়িক ব্যবস্থা। পরবর্তী পঞ্চায়েত নির্বাচন শেষে প্রয়োজনে আবার সংশোধনী আনা যেতে পারে। তিনি পঞ্চায়েতে হিংসামুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং প্রয়োজনে পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন।
একশো দিনের কাজের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিল। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
আইএসএফ বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকী বলেন, এই বিলের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাত থেকে আর্থিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সরকারি আধিকারিকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, সরকারি আধিকারিকরা দুর্নীতি করবেন না—এর নিশ্চয়তা কী? যদি সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
আখরুজ্জামান বিলটিকে ‘গণতন্ত্রবিরোধী’ বলে আখ্যা দেন। তাঁর বক্তব্য, সরকার একদিকে পঞ্চায়েত নির্বাচনের কথা বলছে, অন্যদিকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার আইন আনছে।
তিনি অভিযোগ করেন, এর ফলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। গ্রামের মানুষ ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচিত করলেও তাঁদের হাতে কার্যকর ক্ষমতা থাকবে না। তাঁর পরামর্শ, অনিয়মের অভিযোগে অডিট ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। তিনি বিল প্রত্যাহার অথবা বিধানসভার সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানান।
পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে বলেন, যাঁরা পঞ্চায়েতের টিকিট পেতে অর্থ ব্যয় করেছিলেন এবং পাঁচ বছর ধরে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আশা করেছিলেন, তাঁরাই এখন এই বিলের বিরোধিতা করছেন।
তিনি দাবি করেন, গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে প্রধানদের অস্বাভাবিক প্রভাব ছিল এবং দুর্নীতির কারণে অনেক প্রধানের বিপুল সম্পত্তি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, প্রধানদের আর্থিক ফাইলে স্বাক্ষরের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্দেশ্য কাটমানি প্রথা বন্ধ করা। অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিকাদারদের বিল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখে কমিশনের হার বাড়ানো হতো।
মন্ত্রী আরও বলেন, বিরোধী বিধায়কদের কাছ থেকেও অভিযোগ এসেছে যে বহু এলাকায় বিরোধীদের পঞ্চায়েতে কাজ করতে দেওয়া হয়নি।
একশো দিনের কাজের প্রসঙ্গে তিনি জানান, বর্তমান সরকার ইতিমধ্যেই ১ কোটি ৫৬ লক্ষ কর্মদিবস সৃষ্টি করেছে। অতীতে একশো দিনের কাজের অর্থ বন্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও তিনি এর জন্য দুর্নীতিকেই দায়ী করেন এবং বলেন, অনিয়মের যথাযথ হিসাব দেওয়া যায়নি বলেই সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।