যক্ষ্মা আক্রান্ত ভাইকে ঘাড়ধাক্কা দাদার, আশাকর্মীদের উদ্যোগে ঠাঁই হাসপাতালে
বর্তমান | ২৬ জুলাই ২০২৬
সংবাদদাতা, ঘাটাল: যক্ষ্মার মতো ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ায় জুটল চরম অবহেলা। নিজের ভিটে থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন আপন দাদা ও বউদি। বাধ্য হয়েই প্রবল বৃষ্টিতে পুকুরপাড়ে নোংরা আবর্জনার স্তূপের মাঝে একটি ছেঁড়া ত্রিপলের নীচে বেশ কয়েক দিন ধরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন দাসপুর থানার সিংহচকের বছর বত্রিশের যুবক হীরু দলুই। বিষধর সাপের আতঙ্ক আর অসহ্য রোগযন্ত্রণা, সব মিলিয়ে এক নারকীয় পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি। পাড়া-প্রতিবেশীদের দয়ায় কোনওক্রমে দু’ মুঠো খাবার জুটলেও চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অবশেষে শুক্রবার আশাকর্মীদের হস্তক্ষেপে সোনাখালি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে ওই চরম অসহায় যুবককে।
স্থানীয় সূত্রে বিস্তারিতভাবে জানা গিয়েছে, হীরুবাবুর বাবা ও মা অনেক আগেই মারা গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রীও বহু বছর আগে শিশুকন্যাকে নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছেন। পেটের তাগিদে ভিনরাজ্যে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি সেখানে তাঁর শরীর খুব খারাপ হওয়ায় গ্রামে ফিরে আসেন। চিকিৎসা করতে জানা যায় তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত। অভিযোগ, সে কথা জানতে পেরেই দাদা তপন দলুই এবং বউদি তাঁকে বাড়িতে ঢুকতে দেননি। এমনকি দু’ মুঠো খাবারও তাঁর কপালে জোটেনি। অগত্যা তিনি দাসপুর থানারই জয়রামচকে দিদি মামণি দলুইয়ের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। কিন্তু দিদির আর্থিক অবস্থাও তেমন সচ্ছল নয়। চাষবাসের উপর নির্ভর করেই তাঁদের সংসার চলে। তার উপর বাড়িতে রয়েছেন বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি এবং বসবাসের জন্য রয়েছে একটিমাত্র ছোট ঘর। এই সংক্রামক রোগীকে সেখানে রাখা কার্যত অসম্ভব ছিল। মামণি জানান, তবুও দিন পনেরো ভাইকে নিজের কাছেই রেখেছিলেন তিনি। এরপর গত সপ্তাহে ভাইকে নিয়ে সিংহচকে নিজের বাড়িতে ফেরাতে যান তিনি। মামণিদেবীর অভিযোগ, ভাইকে রাখার কথা বলতেই রেগে আগুন হয়ে ওঠেন দাদা তপনবাবু। বাস্তুর ভাগ তো দেনইনি, এমনকি কোথায় কীভাবে থাকবে, সেই দায়িত্ব নিতেও তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। বোন মামণিদেবী ভাইকে রাখার জন্য সামান্য জোরাজুরি করলে দাদা তপন দোলই তাঁকে রীতিমতো মারধর করেন বলে অভিযোগ। ভাই-বোনের এই গন্ডগোলের খবর শেষ পর্যন্ত থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। এরপরই পুকুরপাড়ে ওই পূতিগন্ধময় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঠাঁই হয় হীরুবাবুর। অসহায় অবস্থায় টানা কয়েক দিন ধরে তিনি ওই পুকুরপাড়ের খোলা আকাশের নিচেই পড়েছিলেন। স্থানীয়দের বক্তব্য, তাঁরা তাকে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করে দিতেন। এমন এক ভয়ংকর পরিবেশে অসুস্থ ভাইকে ফেলে রেখে যেতে মন সায় দেয়নি দিদিরও। অবশেষে আশাকর্মীরদের উদ্যোগে হাসপাতালে ঠাঁই হল তাঁর।