• প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদ করে ছাত্রনেতা থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী, সেই ছাত্র আন্দোলনই কী ভাবে হয়ে উঠল ধর্মেন্দ্র প্রধানের ‘পথের কাঁটা’?
    এই সময় | ২৬ জুলাই ২০২৬
  • দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস! ছোট ছোট ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলে খেলা! কার গাফিলতিতে এমন কাণ্ড? জবাব খুঁজতে ওডিশা স্টেট সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের বাইরে হাজির হয়েছিলেন ১৫০০ জন পড়ুয়া-সহ ABVP-র যুব নেতা-কর্মীরা। দাবি ছিল, এই কাণ্ডে গাফিলতি কার, তা খুঁজে বার করে আনতে হবে এবং শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা। শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলনের প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধে নির্মম ভাবে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নেতৃত্বে থাকা ABVP যুব নেতাকেও ব্যাপক মেরেছিল পুলিশ। হাড় ভেঙে, মাথা ফেটে, সে একেবারে ভয়ঙ্কর কাণ্ড।

    পুলিশের মারে হাড় ভাঙলেও সংকল্প ভাঙেনি সেই যুবনেতার। মাথায় পট্টি, হাতে প্লাস্টার নিয়েই আরও শুরু করেন আরও তীব্র আন্দোলন। সেটাই ছিল ওই যুবকের রাজনৈতিক কেরিয়ারের স্টেপিং স্টোন। ১৯৯৭ সালে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে প্রতিবাদের ঝড় তোলা সেই যুবক হলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তাঁর কেরিয়ারের রাজনৈতিক সূর্যোদয়ের ৩১ বছর বাদে এক প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি ও পড়ুয়াদের বিপ্লব কাড়ল তাঁর মন্ত্রিত্বের সিংহাসন।

    NEET-UG প্রশ্নফাঁস বিতর্ক ঘিরে টানা দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন, বিরোধীদের চাপ এবং সরকারের উপর বাড়তে থাকা রাজনৈতিক চাপের মুখে শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।

    ওডিশার তালচেরে জন্ম ধর্মেন্দ্র প্রধানের। ছাত্রজীবনেই তিনি অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। কলেজে পড়াকালীন ছাত্র সংসদের সভাপতি এবং পরে সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্র আন্দোলনে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতাই খুলে দিয়েছিল গেরুয়া শিবিরের অন্দরে প্রবেশের পথ।

    প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে তাঁর সক্রিয়তা নজরে পড়েছিল তৎকালীন বিজেপির শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের। ১৯৯০-এর দশকে বিজেপির যুব সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান ধর্মেন্দ্র প্রধান। ২০০০ সালে ওডিশার পাল্লাহারা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে দেওগড় লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার (BJYM) সর্বভারতীয় সভাপতি হন। পরে তিনি দলের জাতীয় সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক এবং একাধিক রাজ্যের নির্বাচনী দায়িত্বও সামলান।

    ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভায় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিমন্ত্রী (স্বতন্ত্র দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পান ধর্মেন্দ্র প্রধান। পরে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে পেট্রোলিয়াম, ইস্পাত, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা (Skill Development & Entrepreneurship)-র মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক ছিল তাঁর হাতে।

    ২০২১ সালের জুলাইয়ে প্রধানকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী করে NDA সরকার। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির (NEP) বাস্তবায়ন, ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সংস্কারের মতো একাধিক উদ্যোগ তাঁর মেয়াদে গুরুত্ব পায়।

    ২০২৬ সালের NEET-UG প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর দেশজুড়ে ছাত্র-যুব আন্দোলন শুরু হয়। পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সিবিআই তদন্ত শুরু হয় এবং আন্দোলন ক্রমশ রাজনৈতিক রূপ নেয়। বিরোধীরা সংসদে এবং রাস্তায় ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তোলে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও সরকারের একাধিক দফায় আলোচনা হলেও সমাধান মেলেনি। আন্দোলনকারীরা জানিয়ে দেয়, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে আপস নয়।

    শেষ পর্যন্ত শনিবার ধর্মেন্দ্র প্রধান কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, যন্তর মন্তরে গণ-আন্দোলন এবং জাতীয় স্তরে তৈরি হওয়া ক্ষোভের মধ্যে নেটপাড়ায় ভেসে ওঠে ১৯৯৭ সালের সেই পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং ও ছবি, যেখানে যুবক ধর্মেন্দ্র নিজে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন করেছিলেন, নিজেই সেই ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পদে থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় এড়াতে পারলেন না। ধারাবাহিক ছাত্র বিক্ষোভ, বিরোধী দলগুলির তীব্র আক্রমণ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার মুখোমুখি হয়ে অবশেষে পদত্যাগ জমা দিতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তাঁর ইস্তফার পর দেশজুড়ে আন্দোলনরত ছাত্র সংগঠনগুলি এটিকে বড় জয় বলে দাবি করে। একইসঙ্গে পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতে প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর পদক্ষেপের দাবিও আরও জোরালো হয়েছে।

    ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক যাত্রা ছাত্রনেতা হিসেবে শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কিন্তু NEET প্রশ্নফাঁস বিতর্ক তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সঙ্কট হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত সেই বিতর্কের জেরেই তাঁকে শিক্ষামন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়।

    প্রশ্নপত্র ফাঁসের আন্দোলন একসময়ে এক সাধারণ ছাত্রনেতাকে জাতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছিল, প্রায় ৩০ বছর পর সেই প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যু এবং ছাত্র আন্দোলনই তাঁর শিক্ষামন্ত্রীত্বের মেয়াদের যবনিকা পতন ঘটাল। ভারতীয় রাজনীতিতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির উদাহরণ হয়ে রইল প্রধানের ইস্তফা।

    ছাত্রজীবনে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেন।

    ২০০০ সালে ওডিশার পাল্লাহারা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন।

    তিনি পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস, ইস্পাত, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা এবং পরে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

    ২০২১ সালের জুলাই মাসে তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

    নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) বাস্তবায়ন, ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সংস্কারের ওপর জোর দেন।

    NEET-UG প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হলে তাঁর পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়।

    পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, NTA-র পুনর্গঠন, প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতার দাবি সামনে এসেছে।

  • Link to this news (এই সময়)