এই সময়, নয়াদিল্লি: জন্মের পরে ৭১ দিন, আর প্রথম বার মাঠে নেমে আন্দোলন থেকে ধরলে ৩৬ দিন— এর মধ্যেই প্রথম সাফল্য ‘ককরোচ’দের!
দিনটা ছিল শুক্রবার, ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটা ১৫ মে ২০২৬৷ অনেকেই এক ঝটকায় হয়তো ভেবে বলতে পারবেন না, এই দিনে ঠিক কী ঘটেছিল? তবে শনিবারের পরে এই প্রশ্নটা যে কোনও ইন্টারভিউয়েই আসতে পারে।
উত্তরটা হলো— সেই দিনই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চে একটি মামলার শুনানি চলাকালীন সমাজসৈনিক এবং বেকারদের ‘আরশোলা’ এবং ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে দাবি নেটিজ়েন ও বিরোধীদের একাংশের৷ তাঁদের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে বলে পরে জানান সিজেআই। যদিও তার আগেই প্রধান বিচারপতির এই বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে গোটা দেশে ঝড় উঠেছিল৷ সেই আবহেই ১৬ মে আত্মপ্রকাশ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি৷ প্রথমে এই সিজেপির পরিধি সীমাবদ্ধ ছিল শুধুমাত্র সামাজিক মাধ্যমে৷ বিভিন্ন কটাক্ষ এবং ব্যাঙ্গাত্মক পোস্ট করা হতো একটি সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডল থেকে৷ পরবর্তী সময়ে ‘নিট’–এর প্রশ্নফাঁস ইস্যুকে হাতিয়ার করে পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত্ দীপকে গণ-আন্দোলনের ডাক দেন এবং নিজে বিদেশ থেকে দিল্লি এসে যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া ধর্নায় যোগ দেন৷ বাড়তে থাকে আন্দোলনের উত্তাপও৷ পায়ের তলার মাটি শক্ত হওয়ার আভাস পেয়ে তত দিনে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিও তুলে ফেলেছে সিজেপি৷ ধর্নায় সামিল হন সমাজসেবী সোনম ওয়াংচুক৷ শনিবার আন্দোলনকারীদের দাবি মেনেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান৷ এই সাফল্যকে হাতিয়ার করে এ বার পুুরোদস্তুর রাজনীতির ময়দানে নামার কথাও ভাবতে শুরু করেছেন সিজেপি নেতৃত্ব— শনিবার এমনই দাবি সিজেপি সূত্রে৷ গত সোমবার দিল্লির যন্তর মন্তরে পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জের অভিযোগ তুলে আন্দোলনকারীরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেও প্রথমে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দেয়, এত ভিডিয়ো (লাঠিচার্জের) দেখার সময় আদালতের নেই। তবে শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট এই ইস্যুতে মামলাকারীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রকে প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দেয়।
তাত্পর্যপূর্ণ হলো, এর আগে দেশের স্বাধীনতার ৭৯ বছরের ইতিহাসে এমন কোনও রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি হয়নি, যার জন্মের আড়াই মাসের মধ্যে মাথা ঝোঁকাতে হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে৷ এই কারণেই শনিবার টাইফয়েডে আক্রান্ত সিজেপি প্রধান অভিজিত্ দীপকের গলায় শোনা গিয়েছে গোটা দেশে ভাইরাল হওয়া পংক্তি, ‘দুনিয়া ঝুঁকতি হ্যায়, ঝুঁকানেওয়ালা চাহিয়ে৷’ পর্দার ‘পুষ্পা’র আইকনিক ‘ঝুঁকেগা নহি’র পরে আবার এমন একটি সংলাপ গোটা দেশে ধ্বনিত হচ্ছে, যার মধ্যে দিয়েই ফুটে বেরোচ্ছে ভারতের ‘জেন জি়’-র প্রতিষ্ঠান বিরোধী সুর৷ এই আবহে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরে সিজেআই কান্তের উদ্দেশে দীপকের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘আমি প্রধান বিচারপতিকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। উনি আমাদের ককরোচ না–বললে আমি হয়তো ভারতে আসতামই না।’
আগামী বছরে পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, গুজরাট এবং উত্তরাখণ্ডের বিধানসভা নির্বাচন৷ তা হলে কি এই পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটেই সিজেপি–র হাতে খড়ি হবে?
সংগঠনের এক প্রথম সারির নেতার দাবি, ‘আমাদের দাবি যে এই ভাবে পূরণ হয়ে যাবে, সেটা ভাবনার অতীত ছিল৷ এখনও কিছুটা ঘোরের মধ্যে আছি৷ ঘোর কেটে গেলে আগামীর রূপরেখা স্থির করব৷ আমরা জানি, সামান্য ভুলে চিরকালের মতো ইতিহাসের পাতায় চলে যাব৷’
প্রায় এক দশক আগে একটি আন্দোলনকে ঘিরে জন্ম হয়েছিল আম আদমি পার্টির। পরবর্তীতে যারা বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ও লোকসভা ভোটেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দিল্লি, পাঞ্জাবের মতো রাজ্যে ক্ষমতাতেও ছিল তারা। যদিও যে আদর্শ থেকে আপ–এর জন্ম হয়েছিল, সেখান থেকে তারা পরে সরে আসে বলে মত অনেকেরই। সিজেপি–ও আগামী দিনে সেই পথে হাঁটে কি না, সেটাই এখন দেখার। ইতিমধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, সিজেপি–র এই আন্দোলনের পিছনে বিদেশি ফান্ড কাজ করেছে। যদিও বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্য, ‘এ নিয়ে শেয়ার করার মতো কোনও তথ্য এখনও আমাদের কাছে নেই।’