এই সময়, কল্যাণী: কারও পদবি বিশ্বাস, কারও হোসেন। কেউ দাস, আবার কেউ মণ্ডল — এঁরা প্রত্যেকেই নাকি আদিবাসী! তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তফসিলি উপজাতির ভুয়ো শংসাপত্র ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওই সংরক্ষিত পদে তাঁরা কাজ করছেন। রাজ্যের কলেজ সার্ভিস কমিশন, দমকল বিভাগ ও স্বাস্থ্য দপ্তরে ভুয়ো শংসাপত্র দিয়ে যে নিয়োগ হয়েছিল তার তথ্য প্রমাণ–সহ রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ দপ্তরে অভিযোগ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী কল্যাণ সমিতির রাজ্য পর্যবেক্ষক পার্সাল কিস্কু।
প্রসঙ্গত, ২০২২-এ খড়্গপুর আইআইটি–তে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। ২০২৩-এর ১১ মে তার মেধাতালিকা প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা গিয়েছে, নদিয়ার ধানতলা থানা এলাকার হোসেনপুরের যুবক দেবরাজ বিশ্বাস আদিবাসী সংরক্ষিত পদে নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ আদিবাসী পরিবারের ছেলে হয়েও রাহুল মাণ্ডির নাম ছিল মেধাতালিকার ওয়েটিং লিস্টে! রাহুল ওই চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। পার্সাল কিস্কুর এই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে শুরু হয়। অভিযোগ, ২০১২-য় নদিয়ার রানাঘাট মহকুমাশাসকের দপ্তর থেকে অভিযুক্ত দেবরাজের ওই এসটি সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছিল। গত ৫ জুন সেই সার্টিফিকেট বাতিল করেছেন রানাঘাটের বর্তমান এসডিও মহম্মদ সুবুর খান। তিনি বলেন, 'ওই সার্টিফিকেটটি বাতিল করে জানানো হয়েছে আইআইটি কর্তৃপক্ষকে। থানায় এফআইআর করা হবে।' এই পরিস্থিতিতে চাকরি হারানোর পথে অভিযুক্ত দেবরাজ।
পার্সালের দাবি, 'একটা গভীর যড়যন্ত্র রয়েছে এর পিছনে। দীর্ঘদিন ধরে ভুয়ো আদিবাসী সার্টিফিকেট বের করে সরকারি সুযোগ-সুবিধে নেওয়া হচ্ছে। সংরক্ষিত পদের চাকরি কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একাধিক তথ্যপ্রমাণ-সহ অভিযোগ জানানোর পরে কোনও একটি অজ্ঞাত কারণে সেই তদন্ত দিনের আলো দেখেনি এতদিন।' রাজ্যের ট্রাইবাল ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের জয়েন্ট সেক্রেটারি গত ১৬ জুন অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ দপ্তরের সচিবকে চিঠি দিয়ে লিখেছেন, তদন্তের ভিত্তিতে দেবরাজের কাস্ট সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে। এই কাজের সঙ্গে যে সব সরকারি আধিকারিকরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ভুয়ো নিয়োগের বিষয়ে আইআইটি-র রেজিস্ট্রার অচিন্ত্যকুমার মণ্ডল বলেন, 'দেবরাজ অ্যাফোর্ডেবল হেলথ্ সেন্টারে কর্মরত রয়েছেন। বিষয়টি এখন আমাদের লিগাল সেল দেখছে।'
পার্সালের অভিযোগ, 'কলেজ সার্ভিস কমিশনের ২০২০-এর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী প্রফেসর পদে ১৯ জন ভুয়ো সার্টিফিকেট দিয়ে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত পদে চাকরি করছেন কলেজে। এর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ জানিয়েছি। ২০১৫-এর জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে ১২ জন ঠিক একই ভাবে নিয়োগ হয়েছে, সেটাও অভিযোগে জানিয়েছি।' কলেজ সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৌরেন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'এ ধরনের অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলছেন, 'বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে এ ধরনের ৭০০ ভুয়ো সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে। রাজ্যে এ বিষয়ে তদন্তও শুরু হয়েছে। লক্ষাধিক ভুয়ো শংসাপত্র দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি। এ বছর নভেম্বরের মধ্যে সেই তদন্ত শেষ করে যথাযথ পদক্ষেপ করা হবে। ভুয়ো সার্টিফিকেট দিয়ে পাওয়া চাকরিও বাতিল হবে। পাশাপাশি সেই শূন্য পদে নিয়োগ হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে।' এখন দেখার আইআইটি কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ করবেন।