• বরফে ঢাকা পাহাড়ে লেখা হয়েছিল ভারতের জয়ের ইতিহাস, জানেন ২৬ জুলাই কেন ‘বিজয় দিবস’?
    এই সময় | ২৬ জুলাই ২০২৬
  • চারদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়। উচ্চতা কোথাও ১৩ হাজার ফুট, কোথাও আবার তার থেকেও অনেক বেশি। বাতাসে অক্সিজেন অনেকটাই কম। যেখানে হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় কাবু হয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সেনারাও। এ দিকে পাহাড়ের মাথায় বন্দুক উঁচিয়ে তাক করে রয়েছে শত্রুপক্ষ। আর নীচ থেকে খাড়া পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছেন ভারতীয় সেনারা। মাথার উপর থেকে ছুটে আসছে গুলি। পড়ছে মর্টার। তবু পিছিয়ে আসার উপায় নেই। লক্ষ্য একটাই— দখল হয়ে যাওয়া পাহাড়ের চূড়ায় আবার উড়বে ভারতের জাতীয় পতাকা।

    এ কোনও যুদ্ধের সিনেমার দৃশ্য নয়। ১৯৯৯ সালে কার্গিলের দুর্গম পাহাড়ে এমনই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন ভারতীয় সেনারা। নিয়ন্ত্রণরেখা (Line of Control) পেরিয়ে ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি অবস্থান দখল করে বসেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। সেই অবস্থানগুলি পুনরুদ্ধার করতেই শুরু হয়েছিল কঠিন লড়াই।

    প্রায় তিন মাস ধরে একের পর এক পাহাড়ি অবস্থান পুনর্দখলের অভিযান চালায় ভারতীয় সেনা। এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন বিজয়’। অবশেষে ২৬ জুলাই সফল ভাবে শেষ হয় সেই অভিযান। কার্গিলের দখল হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলিতে ফের প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের নিয়ন্ত্রণ। সেই জয় এবং যুদ্ধে প্রাণ হারানো সেনাদের আত্মত্যাগ স্মরণ করেই প্রতি বছর ২৬ জুলাই পালিত হয় ‘কার্গিল বিজয় দিবস’ (Kargil Vijay Diwas)। ১৯৯৯ সালের সেই ঐতিহাসিক জয়ের ২৭ বছর পূর্ণ হচ্ছে ২০২৬ সালে।

    কী হয়েছিল কার্গিলে?

    ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৯ সালের মে মাসে। শীতকালে কার্গিলের বহু উঁচু পাহাড়ি এলাকায় তাপমাত্রা ভয়ঙ্কর ভাবে নেমে যায়। বরফের চাদরে ঢেকে যায় এলাকা। সেই সময় কয়েকটি অত্যন্ত উঁচু পোস্ট থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার প্রচলন ছিল দুই পক্ষেরই। বসন্তে বরফ গললে আবার সেখানে ফিরে যেতেন সেনারা। কিন্তু ১৯৯৯ সালে পরিস্থিতি বদলে যায়। ৩ মে কার্গিল এলাকায় প্রথম সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে আসে স্থানীয়দের। ভারতীয় সেনা অনুসন্ধান শুরু করতেই সামনে আসে বড়সড় অনুপ্রবেশের ছবি। নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অফ কন্ট্রোল (Line of Control) পেরিয়ে পাকিস্তানি সেনা এবং অনুপ্রবেশকারীরা ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি অবস্থান দখল করে বসেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত উঁচু পাহাড় দখল করা নিয়ে এত উদ্বেগের কারণ কী ছিল?

    এর উত্তর লুকিয়ে ছিল পাহাড়গুলির অবস্থানে। পাহাড়ের উপর থেকে নজর রাখা সম্ভব ছিল গুরুত্বপূর্ণ শ্রীনগর-লেহ জাতীয় সড়কের উপর। এই রাস্তা কাশ্মীরের সঙ্গে লাদাখের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে ওই পাহাড়গুলিতে শত্রুপক্ষের উপস্থিতি ভারতের কাছে বড় নিরাপত্তার ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই দ্রুত সেগুলি পুনর্দখল করা জরুরি ছিল।

    শুরু হলো ‘অপারেশন বিজয়’

    দখল হয়ে যাওয়া এলাকাগুলি পুনরুদ্ধার করতে ভারতীয় সেনা শুরু করে ‘অপারেশন বিজয়’ (Operation Vijay)। কিন্তু কাজটা ততটাও সহজ ছিল না। পাহাড়ি যুদ্ধে সাধারণত পাহাড়ের চূড়ায় থাকা পক্ষ বাড়তি সুবিধা পায়। কারণ সেখান থেকে নীচে থাকা প্রতিপক্ষের গতিবিধি সহজে নজরদারি করা যায়। কার্গিলেও পাকিস্তানি বাহিনী ছিল পাহাড়ের উঁচু অংশে। ফলে ভারতীয় সেনাদের খাড়া পাথুরে ঢাল বেয়ে নীচ থেকে উপরে উঠতে হচ্ছিল। এ দিকে ততদিনে টের পেয়ে যায়, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তার পর শুরু হয় গোলা-গুলি।

    তার পর ২৬ মে ভারতীয় বায়ুসেনাও অভিযানে যোগ দেয়। তাদের অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সফেদ সাগর’ (Operation Safed Sagar)। ভারতীয় নৌসেনাও আরব সাগরে তৎপরতা বাড়ায়। তবে ভারতের সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট। অনুপ্রবেশকারীদের সরানো হবে, কিন্তু ভারতীয় বাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করবে না।

    টোলোলিংয়ে ঘুরল যুদ্ধের মোড়

    এর পর খাড়াই পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে শুরু হলো পুনর্দখলের লড়াই। ভারতীয় সেনাবাহিনী একটার পর একটা পাহাড় পুনর্দখল করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে। তারই মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল টোলোলিং। মে মাসের শেষ সপ্তাহে টোলোলিং পুনর্দখলের জন্য বড় অভিযান শুরু করে ভারতীয় সেনা।

    টোলোলিং থেকে দ্রাস এবং শ্রীনগর-লেহ সড়কের একটা বড় অংশের উপর নজর রাখা সম্ভব ছিল। ফলে জায়গাটি পুনর্দখল করা ভারতীয় সেনার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু শত্রুপক্ষ পাহাড়ের উপরে। ভারতীয় সেনা নীচে। দিনের আলোয় উপরে উঠলেই সহজে নজরে পড়ার আশঙ্কা। তাই অনেক অভিযান চালানো হয়েছিল রাতের অন্ধকারে। দীর্ঘ এবং কঠিন লড়াইয়ের পর ১৩ জুন টোলোলিং পুনর্দখল করে ভারতীয় সেনা।

    এই জয় বদলে দেয় যুদ্ধের আবহ। কারণ ভারতীয় সেনা বুঝিয়ে দিয়েছিল, দুর্গম পাহাড়ের মাথায় শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেও তাদের অগ্রগতি থামানো যাবে না। এর পর সামনে আরও বড় লক্ষ্য— টাইগার হিল।

    এ বার লক্ষ্য টাইগার হিল

    দ্রাসের স্কাইলাইনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা টাইগার হিলের কৌশলগত গুরুত্বও ছিল বিরাট। উচ্চতা প্রায় ১৬,৭০০ ফুট। পাহাড়ের মাথায় শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছিল শত্রুপক্ষ। সরাসরি সামনে দিয়ে উপরে ওঠা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই ভারতীয় সেনারা বিভিন্ন দিক থেকে পাহাড়ের চূড়ার দিকে এগোতে শুরু করেন। রাতের অন্ধকারে খাড়া পাথুরে পথ বেয়ে চলে অভিযান। এই লড়াইয়ের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে গ্রেনেডিয়ার যোগেন্দ্র সিং যাদবের নাম। গুরুতর আহত হওয়ার পরেও তিনি অভিযান চালিয়ে যান। তাঁর অসামান্য সাহসিকতার জন্য পরে তাঁকে পরমবীর চক্রে সম্মানিত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৪ জুলাই টাইগার হিল পুনর্দখল করে ভারতীয় বাহিনী। টোলোলিংয়ের পর টাইগার হিলের জয় স্পষ্ট করে দিয়েছিল, কার্গিলের লড়াই ক্রমশ ভারতের দিকে ঘুরছে।

    পয়েন্ট ৪৮৭৫ এবং বিক্রম বাত্রা

    কার্গিলের ইতিহাস বললে আরও একটি নাম এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব— ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা। পয়েন্ট ৫১৪০ পুনর্দখলের অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। সেই অভিযানের সাফল্যের পর তাঁর বলা ‘ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর’ বাক্যটি গোটা দেশে পরিচিত হয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। এর পর পয়েন্ট ৪৮৭৫ পুনর্দখলের অভিযানে যান বিক্রম বাত্রা। প্রবল লড়াইয়ের মধ্যে সামনে থেকে নিজের দলকে নেতৃত্ব দেন। ৭ জুলাই সেই লড়াইয়েই শহিদ হন তিনি। বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর।তাঁর অসামান্য সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে বীর শহিদ-কে দেওয়া হয় ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বের সম্মান পরমবীর চক্র।

    একে একে ফিরতে থাকে পাহাড়

    টোলোলিং বা টাইগার হিলেই লড়াই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাতালিক, কাকসার, মুশকোহ উপত্যকা, পয়েন্ট ৪৮৭৫-সহ একাধিক জায়গায় তীব্র সংঘর্ষ চলে। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনর্দখল করতে থাকে ভারতীয় সেনা। প্রতিটি পাহাড় ফিরে পাওয়ার সঙ্গে একটু একটু করে বদলাচ্ছিল যুদ্ধের ছবি। পাকিস্তানি বাহিনী এবং অনুপ্রবেশকারীদের পিছিয়ে যেতে হচ্ছিল। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে ‘অপারেশন বিজয়’-এর সাফল্যের কথা ঘোষণা করেন। তবে তখনও অভিযান পুরোপুরি শেষ হয়নি। অবশেষে আসে ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই।

    কেন ২৬ জুলাই ‘বিজয় দিবস’?

    এই দিনেই ‘অপারেশন বিজয়’-এর সফল সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। কার্গিলের দখল হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলির উপর ফের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ভারত। সেই থেকেই ২৬ জুলাই ভারতের কাছে কার্গিল বিজয় দিবস।

    তবে এই জয় এসেছিল বড় মূল্য দিয়ে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কার্গিল যুদ্ধে ৫২৭ জন ভারতীয় সেনা শহিদ হন। আহত হন ১,৩৬৩ জন। অসামান্য সাহসিকতার জন্য চার জনকে পরমবীর চক্র দেওয়া হয়। ন’জন পান মহাবীর চক্র। ৫৫ জনকে দেওয়া হয় বীর চক্র। ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা, লেফটেন্যান্ট মনোজ কুমার পাণ্ডে, গ্রেনেডিয়ার যোগেন্দ্র সিং যাদব, রাইফেলম্যান সঞ্জয় কুমার, ক্যাপ্টেন বিজয়ন্ত থাপার— কার্গিলের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এমন বহু নাম।

    তাই ২৬ জুলাই শুধুই জয়ের দিন নয়

    আজ কার্গিলের সেই পাহাড় অনেকটাই শান্ত। দূর থেকে টাইগার হিল কিংবা টোলোলিংয়ের দিকে তাকালে হয়তো বোঝার উপায় নেই, ১৯৯৯ সালের গরমে এই পাথুরে পাহাড়গুলিতেই চলেছিল ভয়ঙ্কর লড়াই। কিন্তু ২৬ জুলাই এলেই ফিরে আসে সেই ইতিহাস।

    এই দিন শুধু একটি যুদ্ধ জয়ের উদযাপন নয়। যাঁরা আর বাড়ি ফিরতে পারেননি, তাঁদের স্মরণ করার দিন। যাঁরা অসম ভূখণ্ড, প্রবল ঠান্ডা, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং শত্রুর গোলাবর্ষণ উপেক্ষা করে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের সম্মান জানানোর দিন।

    ১৯৯৯ সালের সেই গ্রীষ্মে শেষ পর্যন্ত কার্গিলের পাহাড়ে আবার উড়েছিল তেরঙ্গা। তার পর কেটে গিয়েছে ২৭ বছর। পাহাড় এখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে। প্রতি শীতে এখনও বরফ নামে। কিন্তু সেই পাথুরে পাহাড়ের সঙ্গে চিরকালের মতো জুড়ে গিয়েছে বহু ভারতীয় সেনার নাম। তাই ২৬ জুলাইয়ের গল্প শুধু ‘বিজয়’-এর গল্প নয়। এই গল্প ঘরে ফেরারও, আবার অনেকের আর কোনও দিন ঘরে ফিরতে না-পারারও।

    ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই ‘অপারেশন বিজয়’-এর সফল সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছিল। কার্গিলের দখল হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলির উপর ফের ভারতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই জয় এবং শহিদ সেনাদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে প্রতি বছর ২৬ জুলাই কার্গিল বিজয় দিবস পালন করা হয়।

    কার্গিল সংঘর্ষ হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে। নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পাকিস্তানি সেনা এবং অনুপ্রবেশকারীরা ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি অবস্থান দখল করেছিল।

    ভারতীয় সেনার অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন বিজয়’ (Operation Vijay)। ভারতীয় বায়ুসেনার অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সফেদ সাগর’ (Operation Safed Sagar)।

    টাইগার হিলের কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রায় ১৬,৭০০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়ের উপর থেকে দ্রাস এলাকার বিস্তীর্ণ অংশে নজর রাখা সম্ভব ছিল। তাই টাইগার হিল পুনর্দখল ভারতীয় বাহিনীর কাছে বড় সাফল্য ছিল।

    পয়েন্ট ৫১৪০ পুনর্দখলের অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা। পরে পয়েন্ট ৪৮৭৫-এর লড়াইয়ে সামনে থেকে নিজের দলকে নেতৃত্ব দেন। ৭ জুলাই সেই লড়াইয়ে তিনি শহিদ হন। মরণোত্তর তাঁকে পরমবীর চক্রে সম্মানিত করা হয়।

    কার্গিল যুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতার জন্য চার জনকে পরমবীর চক্রে সম্মানিত করা হয়— ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা, লেফটেন্যান্ট মনোজ কুমার পাণ্ডে, গ্রেনেডিয়ার যোগেন্দ্র সিং যাদব এবং রাইফেলম্যান সঞ্জয় কুমার।

    ১৯৯৯ সালের কার্গিল বিজয়ের ২৭ বছর পূর্ণ হচ্ছে ২০২৬ সালে।

  • Link to this news (এই সময়)