• ‘খাবারের থালা ছেড়ে...’, কার্গিলের সেই স্মৃতি আজও চোখের সামনে ভাসে মৃণালকান্তির
    এই সময় | ২৬ জুলাই ২০২৬
  • ঋতভাষ চট্টোপাধ্যায়

    আজ রবিবার, ২৬ জুলাই। দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে কার্গিল বিজয় দিবস। ১৯৯৯ সালের এই দিনেই পাকিস্তানকে হারিয়ে কার্গিলের বরফে ঢাকা পাহাড়ে তেরঙ্গা উড়িয়েছিল ভারতীয় সেনা। যুদ্ধের পরে আজ কেটে গিয়েছে প্রায় আড়াই দশক। কিন্তু ঐতিহাসিক সেই যুদ্ধের স্মৃতি এতটুকু মুছে যায়নি। এমনটাই মনে করেন সিউড়ির হাটজনবাজার কলোনির বাসিন্দা মৃণালকান্তি দাস। কার্গিলের যুদ্ধে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। জীবনের বাজি রেখে দেশের জন্য লড়েছিলেন এই সেনাকর্মী। এমনকী, দেশের প্রতি মৃণালকান্তির ভালোবাসা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন তাঁর ছেলে সুকান্ত দাস। বর্তমানে তিনিও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে রয়েছেন।

    কার্গিলের যুদ্ধে মৃণালকান্তি ভারতীয় সেনার ‘কর্পস অব সিগন্যালস’ বিভাগে সিগন্যাল অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে স্পেশাল কমিউনিকেশন ডিটাচমেন্টরের প্রধান সদস্য হিসেবে মৃণালকান্তিকে পাঠানো হয় কার্গিল থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে পান্দ্রাসে। সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা ছিল তাঁর ও তাঁর দলের মূল দায়িত্ব। প্রতি মুহূর্তে সেখানে মৃত্যুর ভয় তাড়া করে বেড়াত মৃণালকান্তিকে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজও শিহরিত হয়ে ওঠেন তিনি।

    মৃণালকান্তি বলেন, ‘দ্রাসের ক্যাম্পে সবে রাতের খাবার খেতে বসেছি। হঠাৎ ২০০-২৫০ মিটার দূরে শুরু হলো পাক সেনাদের অবিরাম বোমা বর্ষণ। খাবারের থালা ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে হয়েছিল। প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে চলেছিল সেই তাণ্ডব। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আর বুঝি প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফেরা হবে না।’ মৃণালকান্তি আরও জানিয়েছেন, যুদ্ধের ময়দানের সামনে আর পিছনে— দুই জায়গাতেই সিগন্যালসদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কারণ নিখুঁত যোগাযোগই লড়াইয়ের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

    যুদ্ধের সময়ে শত্রুর আক্রমণের পাশাপাশি তীব্র সঙ্কট ছিল খাবারের। প্রথম কয়েকদিন রান্না করার মতো কোনও পরিবেশ ছিল না। গ্রামবাসীরা রাতের অন্ধকারে রুটি আর ডাল এনে দিতেন। তা খেয়েই সেনা জওয়ানরা লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতেও দেশের জন্য লড়াই করার উদ্যমে কোনও খামতি ছিল না ভারতীয় সেনাদের। মৃণালকান্তি বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্বের সামনে নিজের জীবনের মূল্য কতটুকু? আমাদের লক্ষ্য ছিল একটাই— হয়তো জিতব, নয়ত প্রাণ দেবো।’ তার পরে ​অবশেষে আসে সেই মুহূর্ত— ২৬ জুলাই। আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হয় ভারতের জয়। সেদিন সমস্ত কষ্ট ভুলে আনন্দ মেতেছিলেন ভারতীয় সেনারা। আজ, এত বছর পরে নিজের বাড়িতে বসে সে দিনের কথা ভাবলে গর্বে বুক ভরে ওঠে মৃণালকান্তির।

    মৃণালকান্তির দেশপ্রেম ছোটবেলা থেকেই অনুপ্রাণিত করেছিল তাঁর ছেলে সুকান্তকে। তাই তিনিও বড় হয়ে যোগ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। প্রায় ১৩ বছর আগে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন সুকান্ত। বর্তমানে তিনি অসমে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আর্টিলারি বিভাগের ক্লার্ক পোস্টে কর্মরত।

    1. কার্গিল যুদ্ধে মৃণালকান্তি দাসের ভূমিকা কী ছিল?

    উত্তর: তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘কর্পস অব সিগন্যালস’-এ সিগন্যাল অপারেটর ছিলেন। যুদ্ধের সময় পান্দ্রাস এলাকায় সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

    2. কোথায় দায়িত্বে ছিলেন তিনি?

    উত্তর: কার্গিল থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরের পান্দ্রাস এলাকায় স্পেশাল কমিউনিকেশন ডিটাচমেন্টের সদস্য হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

    3. যুদ্ধের সময় কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল?

    উত্তর: পাক সেনার লাগাতার গোলাবর্ষণ, প্রাণহানির আশঙ্কা, খাবারের সংকট এবং খোলা আকাশের নীচে টানা ১৩ দিন দায়িত্ব পালন— সবকিছুর মধ্যেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছিল।

    4. সেনারা খাবারের ব্যবস্থা কীভাবে করতেন?

    উত্তর: যুদ্ধের প্রথম কয়েকদিন রান্নার সুযোগ ছিল না। স্থানীয় গ্রামবাসীরা রাতের অন্ধকারে রুটি ও ডাল পৌঁছে দিতেন, যা খেয়েই সেনারা দায়িত্ব পালন করতেন।

    5. ২৬ জুলাই দিনটি কেন বিশেষ?

    উত্তর: ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্গিল যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। সেই স্মরণে প্রতি বছর এই দিনটি কার্গিল বিজয় দিবস হিসেবে পালিত হয়।

  • Link to this news (এই সময়)