নিতাই রক্ষিত
কার্গিল বিজয় দিবস ভারতীয় বীরদের সাহস, আত্মত্যাগ এবং অটল সংকল্পকে শ্রদ্ধা জানানোর দিন। ২৭ বছর আগের স্মৃতি। নিয়ন্ত্রণরেখা পার করে পাকিস্তানের সেনাদের ভারতে প্রবেশ, দেশকে বাঁচাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন বিজয়’— সেই দিনগুলির কথা মনে করলে আজও রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে প্রত্যেক ভারতীয়র। পশ্চিম মেদিনীপুরের কার্গিল যোদ্ধা অনুপম সিংহ প্রতি বছর ২৬ জুলাই নিজের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, কার্গিলের বীর শহিদদের স্মরণ করেন এবং যুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করেন। তাঁর কাছে কার্গিল বিজয় মানেই আত্মত্যাগ, সাহস এবং দেশের মাটিতে মাথা ঠেকানোর দিন।
সে দিন যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন অনুপম সিংহ। আর্মি সার্ভিস কর্পস-এর (ASC) অংশ ছিলেন তিনি। পাকিস্তানের সেনার গোলাবর্ষণে জখম হওয়া প্রাক্তন এই সেনাকর্মী আজও সেই দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ভিজে ওঠে চোখের পাতা। তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভারত মায়ের বীর সন্তানদের আত্মত্যাগের সেই বীর গাঁথা।
মেদিনীপুর শহরের সূর্যনগরের বাসিন্দা অনুপম সিংহ ১৯৯৬ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমদিকে তাঁর পোস্টিং ছিল রাজস্থানে। কিন্তু ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধ শুরু হলে তাঁকে জম্মু ও কাশ্মীরে পাঠানো হয়। যুদ্ধের সময়ে তিনি ছিলেন কাশ্মীরেই। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন তিনি। অনুপম সিংহ ৫১৩৩ এএসসি (ASC) ব্যাটালিয়নের সদস্য ছিলেন।
সেনাবাহিনীর ড্রাইভার হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে দিনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অনুপম সিংহ জানান, যুদ্ধের সময়ে একদিন তিনি কয়েকজন সেনাকে নিয়ে কাশ্মীরের গুমরি থেকে খালসির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। পথে জ়িরো পয়েন্টের কাছে পাকিস্তানের বাহিনীর তীব্র গোলাবর্ষণের মুখে পড়ে তাঁদের গাড়ি। পরিস্থিতি বুঝে তাঁরা গাড়ি থামিয়ে একটি পাহাড়ের ঢালে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু শত্রুপক্ষের ছোড়া একটি গোলার স্প্লিন্টার এসে লাগে অনুপম সিংহের হাঁটুতে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সেনা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। হাসপাতালে কয়েকদিন চিকিৎসাধীনও ছিলেন।
সেই হাসপাতালের বেডে শুয়েই বাংলার এই বীর সন্তান জানতে পারেন, তাঁর সহযোদ্ধারা পাকিস্তানের সেনাদের দুরমুশ করে দিয়েছে। কার্গিলের প্রান্তরে উড়েছে তিরঙা বিজয় কেতন। অনুপম সিংহ জানান, এই খবর শুনে এক মুহূর্তের জন্য শরীরের সমস্ত ব্যথা, যন্ত্রণা উধাও হয়ে গিয়েছিল সে দিন।
আজও বুকের গভীরে সেই দিনগুলোর স্মৃতি টাটকা। খুব যত্নে আগলে রেখেছেন সে সব। তাঁর বাড়িতে সেনাজীবনের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি সংরক্ষণ করা রয়েছে। সেনার যে পোশাক তিনি পরতেন, আজও সযত্নে আলমারিতে তুলে রাখা আছে। মাঝেমধ্যেই সেই পোশাক বের করে ছুঁয়ে দেখেন। চোখের সামনে ভিড় করে বহু স্মৃতি।
সেনাবাহিনীর পোশাক হাতে নিয়ে অনুপম সিংহ বলেন, ‘প্রত্যেক ভারতীয় চান এই পোশাক পরতে। কিন্তু সকলের সেই সুযোগ হয় না। আমি সৌভাগ্যবান যে এই পোশাক পরার সুযোগ পেয়েছি। ভারত মাতার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
সেনার পোশাকে থাকা প্রতিটি ব্যাজ তাঁর কাছে অলঙ্কার। প্রতিটি ব্যাজ তাঁর কর্তব্য, সম্মান এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন অনুপম সিংহ। বর্তমানে তিনি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের একজন অস্থায়ী কর্মী। প্রতি বছর ২৬ জুলাই তিনি নিজের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।