• আয়-সঞ্চয় বিলিয়ে স্কুল আগলে গঙ্গাধর, রোজ নেন ক্লাসও
    এই সময় | ২৭ জুলাই ২০২৬
  • সূর্যকান্ত কুমার, কালনা

    কর্মজীবনের পরে অবসর জীবনই স্বাভাবিক। তবে ব্যতিক্রমও আছে। কেউ কেউ কর্মজীবনকে টেনে নিয়ে যান অবসর জীবনেও। যেমন পূর্ব বর্ধমানের কালনার অকালপৌষের তেহাটার গঙ্গাধর পাল। পড়ানোই তাঁর ধ্যান, জ্ঞান। স্কুল এবং পড়ুয়ারাই তাঁর প্রাণ। তাই অবসরের পরেও আড়াই বছর রোজ স্কুলে যান, স্বেচ্ছায় নিয়মিত ক্লাস নেন। এখানেই শেষ নয়। অবসরের আগে তিনি যত দিন বেতন পেয়েছেন, প্রতি মাসে সেই টাকা থেকে এক টাকা নিজের জন্য রেখে বাকিটা জমিয়েছেন। সেই জমানো টাকা খরচ করেছেন স্কুলের কাজে। অবসরের পরে যে টাকা পেয়েছেন, তার সুদে বেতন দেওয়া হচ্ছে তাঁরই স্কুলের দুই শিক্ষককে।

    অকৃতদার গঙ্গাধরের বয়স এখন ৬৮। বাংলা ও সংস্কৃতে ডাবল এমএ। তাঁর শিক্ষকতার জীবন জুড়ে রয়েছে কালনার কুতুবপুর মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র। এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। স্কুলটিতে পঞ্চম থেকে অষ্টম পর্যন্ত পড়ানো হয়। পড়ুয়ার সংখ্যা ১৪৮। স্কুলে রয়েছেন দু'জন শিক্ষক। আর রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত গঙ্গাধর এবং দু'জন অস্থায়ী শিক্ষক। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গঙ্গাধরের সারা জীবনের সঞ্চয়ের সুদের টাকা থেকে অস্থায়ী শিক্ষকদের এক জনের সম্পূর্ণ, আর এক জনের আংশিক বেতন দেওয়া হয়। সহকর্মীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে মাত্র তিন দিন তিনি ছুটি নিয়েছেন। ২০২৩–এর অক্টোবরে অবসরের পরের দিন থেকেই এখনও তিনি স্বেচ্ছায় ক্লাস নিচ্ছেন। এই অবসর জীবনে একদিনও এমন হয়নি যে, স্কুলের ঘণ্টা বেজেছে, অথচ গঙ্গাধর অনুপস্থিত।

    বলছেন, 'এক টাকা রাখতাম নিজের কাছে, গুরুদক্ষিণা হিসেবে। বাকিটা জমাতাম। এক বা দেড় লাখ টাকা জমলে সেই টাকায় কখনও স্কুলে জলের পাম্প কেনা হয়েছে। কখনও ক্লাসরুম তৈরিতে বা চেয়ার, বেঞ্চ বানাতে সেই টাকা খরচ হয়েছে। আমার তিন বিঘের মতো চাষের জমি থেকে যা আয় হয়, তাতেই আমার চলে যায়।' অবসর জীবনেও পড়ানোর সিদ্ধান্ত কেন? বললেন, 'পড়ুয়াদের নিজের ছেলেমেয়ের মতো ভালোবাসি। ওদের কথা ভেবেই স্কুলে যাই।' সংস্কৃতের টেক্সট বইও লিখেছেন গঙ্গাধর।

    এলাকার বাসিন্দা শেখ সুজাউদ্দিন ওই স্কুলের অস্থায়ী শিক্ষক। তিনি বাংলায় এমএ। তাঁর বেতনের ব্যবস্থা করেছেন গঙ্গাধর। তাঁর কথায়, 'চাকরির শেষে ছ'লক্ষ টাকা জমেছিল। সেই সময়ে স্কুলে এক জন শিক্ষকের খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ওই টাকায় যে সুদ পাই, তাতেই সুজার বেতনটা হয়ে যায়। আরও এক জনের বেতনের কিছুটা দেওয়া হয় আমার টাকা থেকেই।'

    প্রবীণ গঙ্গাধরের কথা স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘোরে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি সাদ্দাম হক বললেন, 'ওঁর ঋণ শোধ করা যাবে না।' এক অভিভাবক মন্টু শেখ বললেন, 'স্যরের জন্য আমরা গর্বিত।' অষ্টমের পড়ুয়া সাইনাজ় খাতুনের কথায়, 'স্যরই আমাদের আদর্শ।'

  • Link to this news (এই সময়)