সুমন ঘোষ
চোখ খুলে দিল বর্ষা। জলমগ্ন ধর্মা, জলমগ্ন পিলগ্রিম সড়ক। হাতে জুতো নিয়ে হাঁটু জলে ঝুঁকি নিয়ে চলেছেন পথচারী। রাস্তায় প্রবল যানজট। ধীরে ধীরে চলেছে বাস-লরি-অটোরিকশা-টোটো-সাইকেল রিকশা। এই পিলগ্রিম সড়ক এখন জাতীয় সড়ক হয়েছে। অথচ, জলমগ্ন রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য দেখা যেত না। ঐতিহাসিক মেদিনীপুর শহরে ঢোকার আগে বাইরের মানুষের কাছে এই চিত্র যে সুখকর নয়, তা অনেকেই জানেন ও মানেন। ইতিমধ্যেই শহরের নিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে বিধানসভায় প্রশ্ন তুলেছেন মেদিনীপুরের বিধায়ক শঙ্কর গুছাইতও।
জল পেরিয়ে শহরে ঢুকলে দেখা যাবে, বিভিন্ন রাস্তার জলছবি। আর রাস্তা-জুড়ে কিলবিল করছে মানুষ। বেড়েছে বসতি। বেড়েছে পুরসভার ওয়ার্ড। মানুষের চাপ বেড়েছে শহরে। কারণ, একাধিক নতুন স্কুল-কলেজ হয়েছে। হয়েছে গুচ্ছের শপিং মল, দোকান-বাজার। এক সময়ে যে শহরে পরিবহণ ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রাম (পালবাড়ি এলাকায় মাটি খুঁড়লে এখনও লোহার পাত মিলতে পারে), এখন সেই শহর থেকে কমবেশি ৭০০ বাস প্রতিদিন ঢোকে ও বেরোয়।
শহরে বেড়েছে মোটরবাইক, ব্যক্তিগত চারচাকার গাড়ি। হাজার খানেক অটো-টোটো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ, রাস্তা সেই একই। উল্টে জবর-দখলকারীদের দাপটে সঙ্কুচিত হয়েছে আরও। তার উপর রাস্তার ধারেই মোটর সাইকেল, সাইকেল, চার চাকার গাড়ি রেখে জিনিস কিনছেন ক্রেতারা। ফলে এক এক সময় রাস্তা খুঁজে পাওয়ায় কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন সরকার অবশ্য বেআইনি দখলদারদের সরিয়ে রাস্তা কিছুটা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। কিন্তু তা দিয়ে কী শহরের গতি বাড়ানো সম্ভব হবে?
অথচ, এই শহরের পঞ্চুরচক, বটতলাচক, স্কুল বাজার হয়েও এক সময়ে বাস যাতায়াত করত। আজ তা কল্পনার অতীত। তা হলে শহরে গতি আনতে কী প্রয়োজন? মেদিনীপুর পুর কর্তৃপক্ষ মনে করেন, শহরকে বাঁচাতে হলে সবার আগে জরুরি উড়ালপুল তৈরি এবং দ্বারিবাঁধ খালের সংস্কারের পাশাপাশি ধর্মার দিকে নতুন বড় নিকাশি নালা তৈরি করতে হবে। চাপ কমাতে শহরের বাইরে তৈরি করতে হবে একটি বাসস্ট্যান্ড। কিন্তু দেড়শ বছর পার করা পুরসভায় তা এতদিন হয়নি কেন?
মেদিনীপুর পুরসভার জন্ম ব্রিটিশ আমলে, ১৮৬৫ সালে। কিন্তু কতগুলো ওয়ার্ড নিয়ে পুরসভা তৈরি হয়েছিল তার কোনও নথি নেই। মেদিনীপুর পুরসভার টানা ৬ বারের প্রবীণ কাউন্সিলর শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বাপ-ঠাকুর্দার মুখে শুনেছি যে, ৫টি ওয়ার্ড নিয়ে নাকি পুরসভা তৈরি হয়েছিল।’ তবে এক সময় যে ১২টি ওয়ার্ড ছিল, তার ইঙ্গিত মেলে। নথি মেলে ১৯টি ওয়ার্ডরও। পুরসভা দেড়শ বছর উদযাপনের সময়ে ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে তৎকালীন কাউন্সিলর নির্মাল্য চক্রবর্তী এই সমস্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘খুব পুরোনো নথি পাওয়া যায়নি। তা পেলে হয়তো ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হতো।’ পরবর্তীকালে ওয়ার্ড বেড়ে ২১টি হয়, আরও পরে হয় ২৪টি। আর ২০১৩ সালে হয় ২৫টি ওয়ার্ড। এখনও তাই রয়েছে। নতুন সরকারের জনগণনার ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়বে কি না, তার উত্তর দেবে সময়।
শহরের চাপ কমাতে, বসবাসের উপযোগী করে তুলতে তিনটি বিষয়ে সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অথচ, একটিও বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রথমটি হলো, তোড়াপাড়া থেকে ধর্মা, হোসনাবাদ হয়ে কংসাবতী নদী পর্যন্ত একটি মহানালা। সেটি না থাকায় ধর্মা, সূর্যনগর, রামকৃষ্ণনগর থেকে শুরু করে পুরোনো আমলের চাষের জমিতে গড়ে ওঠা বাড়ির একতলায় জলে ভরে যায়।
দ্বিতীয়টি হলো, বটতলাচক থেকে স্কুলবাজারের উপর দিয়ে জগন্নাথমন্দির বা গান্ধীঘাট পর্যন্ত উড়ালপুল তৈরি। দ্বিতীয় একটি উড়ালপুল পঞ্চুর থেকে হোক কর্ণেলগোলার উপর দিয়ে ধর্মা পর্যন্ত।
তৃতীয়টি হলো, মেদিনীপুর শহর থেকে কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড সরিয়ে জামবাগানে নিয়ে যাওয়া।
প্রবীণ কংগ্রেস কাউন্সিলার শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘১৯৯৫ সালে পুরপ্রধান থাকার সময়ে এই সব প্রস্তাব দিয়েছি। ২০১৫ সালে জেলা পরিকল্পনা কমিটির নির্বাচিত সদস্য হয়েও ওই সমস্ত প্রস্তাব লিপিবদ্ধ করিয়েছি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বামফ্রন্ট বা তৃণমূল সরকারই — কেউই তা বাস্তবায়িত করেনি। আমি এখনও মনে করি, এগুলি না করলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য থাকবে না এই শহর। পাঁচ মিনিটের পথ ২৫ মিনিটেও যাওয়া যাবে না।’ পুরসভার প্রাক্তন বাম কাউন্সিলার কীর্তি দে বক্সীও বলেন, ‘উড়ালপুল ছাড়া এই শহরের গতি স্তব্ধ হয়ে পড়বে। ধর্মার দিকে নিকাশি মহানালা ও শহরের বাইরে বাসস্ট্যান্ডও জরুরি।’
কারণ, জনসংখ্যার চাপ। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩১ সালে মেদিনীপুর শহরের জনসংখ্যা ছিল ৩২০২১। ২০১১-এর আদমসুমারী অনুযায়ী, প্রতি ১০ বছরে গড়ে ১০ হাজার মানুষ বেড়েছে শহরে। তবে ১৯৯৮ সালের পর থেকে দু’টি কারণে জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে বেশি মানুষ শহরে আসতে শুরু করেন। প্রথমত, গ্রামগঞ্জে তীব্র রাজনৈতিক অশান্তি এবং দ্বিতীয়ত, সন্তানের উন্নত লেখাপড়া ও স্বাস্থ্যের কথা। ২০১১ সালে জনসংখ্যা বেড়ে হয় ১,৬৯,১২৭। মেদিনীপুর পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে সেই জনসংখ্যা ২ লক্ষ ৮০ হাজার থেকে ৩ লক্ষের কাছে। তবে এই জনসংখ্যা কিন্তু সঠিক তথ্য দেয় না। কারণ, বর্তমানে এই শহরে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। গড়ে উঠেছে একাধিক সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, মেডিক্যাল কলেজ, আইন কলেজ প্রভৃতি। রাজ্যের বিভিন্ন জেলার ছাত্র, শিক্ষকরা মেস বা হস্টেলে থাকেন। মেদিনীপুর সদর শহর হওয়ায় অফিস, আদালতে বহু মানুষ সকাল থেকে ভিড় জমান। বহু আধিকারিক, কর্মীও বাইরে থেকে আসেন। বহু বাস, লরি ঢোকে। এটা ভুললে চলবে না যে, তাঁরা সকলেই এই শহরের রাস্তা ব্যবহার করেন, তাঁদের স্নানের জল নিকাশি নালা দিয়ে বেরোয়। সব জেনেও তা হলে করণীয় কাজগুলি হয়নি কেন?
মেদিনীপুর পুরসভার পুরপ্রধান সৌমেন খান হতাশার সুরে বলেন, ‘এই প্রস্তাব তো বহু আগে থেকেই দেওয়া রয়েছে। উড়ালপুল থেকে মহানালা, বাইরে বাসস্ট্যান্ড নির্মাণ — সবই খুব জরুরি। কিন্তু না হলে কী করতে পারি। সব প্রস্তাবই রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো রয়েছে।’
এ বার সরকার বদলেছে। আশায় বুক বাঁধছেন মেদিনীপুর শহরের মানুষ। সম্প্রতি মেদিনীপুর বিধানসভার বিধায়ক শঙ্কর গুছাইত নিকাশি নিয়ে বিধানসভাতেও প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। IIT খড়্গপুরকে দিয়ে নিকাশি ব্যবস্থার পরিকল্পনা করার জন্য পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
বিধায়ক এই সময় অনলাইনকে বলেন, ‘শহরের বাইরে বাসস্ট্যান্ড তৈরি নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই পরিবহণ দপ্তরের আধিকারিকদের নিয়ে জামবাগান এলাকায় জমি পরিদর্শন হয়েছে। এ বিষয়ে ভূমি দপ্তরের সঙ্গে আলোচনাও চলছে।’ উড়ালপুল নিয়ে বিধায়কের বক্তব্য, ‘উড়ালপুল তৈরিও জরুরি। তার জন্য বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। ধীরে ধীরে করার চেষ্টা করব।’
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ওডিশা রাজ অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গের ১০৭৮ খ্রীষ্টাব্দের একটি লিপি অনুযায়ী, তাঁর রাজ্যের পূর্বদিকে ছিল সমুদ্র, পশ্চিমদিকে পর্বতমালা, দক্ষিণে গোদাবরী নদী ও উত্তর প্রান্তে মিধুনপুর। ‘আইন-ই-আকবরী’তে ‘মিদনাপুর’-এর উল্লেখ রয়েছে। আর ‘মেদিনীকোষ’ গ্রন্থের লেখক হরিসাধন দাসের মতে, আনুমানিক ১২৩৮ সালে মেদিনীপুর শহরের প্রতিষ্ঠা করেন গণ্ডিচাদেশের সামন্ত রাজা প্রাণকরের পুত্র মেদিনীকর। তাঁর নাম থেকেই মেদিনীপুর। ইতিহাসবিদদের দাবি, ঐতিহাসিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও মেদিনীকরকে এই শহরের প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন। ১২০০-১৪৩১ সালের মধ্যে শহরের কর্ণেলগোলা এলাকায় দুর্গও নির্মাণ করেছিলেন। মেদিনীপুর শহরের পত্তন নিয়ে এমনই নানা ইতিহাসবিদের নানা মত থাকলেও শহরের প্রাচীনত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই।
নামকরণের ইতিহাস জানতে শহরের বিভিন্ন এলাকার নামই যথেষ্ট বলে মনে করেন মেদিনীপুরের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করা মানুষজন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, কোনও এক সময়ে দুর্গ ছিল কর্ণেলগোলায়। দুর্গের পাশেই ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর পদস্থ আধিকারিক কর্ণেলদের অফিস ও বাসস্থান। তা-ই নাম হয়ে থাকতে পারে কর্ণেলগোলা। যার একদিকে রয়েছে রাজাবাজার। অর্থাৎ রাজা ও রাজার পদস্থ সৈনিকরা সেখানে বাজার করতেন। তারপরই রয়েছে খাপ্রেলবাজার (করপোরেল), যেখানে কর্ণেলদের পরের পদ মর্যাদার আধিকারিকরা থাকতেন। তাই হয়তো নাম কর্পোরেল বাজার। অপভ্রংশে খাপ্রেল হয়েছে। তারপর সিপাহী বাজার। অধস্তন সিপাহী থাকত বলেই হয়তো এই নামকরণ।
এ বার আসা যাক, উল্টোদিকে। কোতয়ালি বাজার, বড়বাজার, ছোটবাজার, সঙ্গতবাজার, বিবিগঞ্জ, চিড়িমারসাই প্রভৃতি। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রতিটি এলাকার নামের পিছনে রয়েছে একটি ইতিহাস। অর্থাৎ কোতয়ালদের থাকার পাশাপাশি কেনাকাটার জন্য বড় ও ছোট দু’টি বাজার ছিল। সঙ্গতবাজারে ছিল নৃত্য ও সঙ্গীতের আয়োজন ও সম্ভার। এখনও যেখানে সঙ্গীত শিল্পের নানা সরঞ্জাম বিক্রি হয়। আর বিবিগঞ্জ মানে একটু অন্যরকম স্বাদ। সেখানে দেহ পসারিনীদের সঙ্গ মিলত। যা পরবর্তীকালেও বহু সময় ধরে রানা গলি নামে খ্যাত ছিল। আর পাখি শিকারীদের জন্য চিড়িমারসাই।
মেদিনীপুর শহর যে স্বাধীনতার পীঠস্থান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কুখ্যাত ইংরেজ শাসক পেডি, বার্জ, ডগলাসকে হত্যার ঘটনা, তার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ফাঁসি। গুপ্ত সমিতি গঠন থেকে ব্রহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার আগেই প্রতিষ্ঠা মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের। ঋষি রাজনারায়ণ বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, কে আসেননি মেদিনীপুর শহরে? প্রখ্যাত ইতিহাসবিদরাও এসেছিলেন। মেদিনীপুর শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাস বলতে গেলে লেখা দীর্ঘ হবে। যেখানে ১৯২৪ পানীয় জল সরবরাহের জন্য জলট্যাঙ্ক তৈরি হয়। ১৮৫৪ সালে দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরি হয়। পরবর্তীকালে শয্যা, ইন্ডোর চিকিৎসা। আর ১৯৩৯ সালে অপারেশন থিয়েটার। যেখানে আজ মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হয়েছে।