• অবসরবেলায় ‘স্যর’-কে ‘গুরুদক্ষিণা’ দিতে মরিয়া বর্তমান ও প্রাক্তন পড়ুয়ারা
    এই সময় | ২৭ জুলাই ২০২৬
  • গৌরব বিশ্বাস

    ঋষি আয়োধধৌম্য ও তাঁর শিষ্য আরুণির সেই গল্পটা মনে আছে? গুরুর আদেশে খেতের আল বাঁধতে গিয়েছিলেন আরুণি। কিন্তু, কোনও ভাবেই জল আটকাতে না-পেরে নিজেই সেখানে শুয়ে পড়েন এবং জল আটকে দেন। ঋষি তাঁর শিষ্যের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে নতুন নামও দেন— উদ্দালক।

    ওডিশার কটকে র‍্যাভেনশ স্কুলে পড়তেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তাঁর প্রিয় শিক্ষক ছিলেন ওই স্কুলেরই বেণীমাধব দাস। স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করার ‘অপরাধে’ সেই শিক্ষককে নদিয়ার কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে বদলি করে দেয় ব্রিটিশ সরকার। স্কুল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বেণীমাধব। সুভাষ-সহ অসংখ্য পড়ুয়া সে দিন কাঁদতে কাঁদতে ‘মাস্টারমশাই’কে বিদায় জানিয়েছিলেন। তার বহু বছর পরে, ১৯১৩-য় সেই শিক্ষকের টানেই কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন সুভাষচন্দ্র।

    ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক এক সময়ে এমন আত্মিকই ছিল। সময়ের উপরে সময়ের প্রলেপ পড়তে পড়তে কিংবা ঘটনার ঘনঘটায় সেই সম্পর্ক কি এখন তবে স্রেফ স্মৃতি? দুয়ারে কড়া নাড়ছে আরও একটি ৫ সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবস। এই আবহে ফের শুরু হবে তর্ক-বিতর্ক। প্রতি বছর যেমন হয়। তবে, সে সব শুরু হওয়ার আগে, শ্রাবণের গুমোট গরমে এক ঝলক দখিনা হাওয়ার মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে উঠল— ‘আমাদের গর্ব, আমাদের অনুপ্রেরণা সুহৃতোষ স্যরকে জাতীয় শিক্ষকের মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানাই।’

    কারা সেই দাবি জানাচ্ছেন? সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টানো পোস্টারে উত্তরও রয়েছে— সেই নদিয়ারই যমশেরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও প্রাক্তনীরা। জেলার প্রান্তিক জনপদ, কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর জন্মস্থান যমশেরপুরে বিএন (ভূপেন্দ্রনারায়ণ) হাইস্কুল পথচলা শুরু করে ১৮৯৯-এ। ১৯৯০-এর ২২ অক্টোবর সেই স্কুলে যোগ দেন জীববিদ্যার শিক্ষক ড. সুহৃতোষ বিশ্বাস। করিমপুরের অভয়পুর গ্রামের বাসিন্দা সুহৃতোষ নিজে লেখাপড়া করেছেন স্থানীয় জগন্নাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে উচ্চ-শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

    পড়ুয়া অন্ত প্রাণ, প্রচারবিমুখ ওই শিক্ষক স্কুল থেকে অবসর নিচ্ছেন আগামী ৩০ নভেম্বর। ঠিক তার আগে স্কুলের বর্তমান পড়ুয়া ও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তনীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, ‘স্যর’-এর ‘ফেয়ারওয়েল’ স্মরণীয় করে রাখতে হবে। তাঁদের কাছে সুহৃতোষ ‘জাতীয় শিক্ষক’-এর চেয়েও বড় কিছু। কিন্তু, সরকারি ভাবে তিনি যাতে সেই সম্মান পান তার জন্য আদাজল খেয়ে লেগে পড়ে ছাত্রদল। সম্প্রতি প্রাক্তনী ও বর্তমান পড়ুয়াদের অনেকেই চলতি মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা দপ্তরের ‘সিলেকশন কমিটি’র কাছে আবেদন করেছেন। চিঠি পাঠিয়েছেন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরেও। বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে সেটাই হবে তাঁদের ‘গুরুদক্ষিণা’।

    ‘শাসন করা তারেই সাজে/ সোহাগ করে যে গো’— বিএন হাইস্কুলে পা রাখার প্রথম দিন থেকে রবি ঠাকুরের এই লাইন দুটো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন সুহৃতোষ। ছাত্রছাত্রীদের আজও স্পষ্ট মনে আছে, ক্লিন সেভ্‌ড মুখ, পরনে ফরম্যাল পোশাক আর গলায় ঝুলছে একটি হুইস্‌ল। জীববিদ্যার শিক্ষকের গলায় হুইস্‌ল কেন? শৃঙ্খলাভঙ্গ রুখতে। লেখাপড়ার ব্যাপারে সুহৃতোষের মনোভাব ছিল, ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার।’ কিন্তু, ডিসিপ্লিন না-মানলে এক্কেবারে জ়িরো টলারেন্স নীতি এবং শাসন। তিনি নিজেও কখনও শৃঙ্খলার ব্যাপারে আপস করেননি। মোটরবাইক খারাপ বা অন্য কোনও কারণে প্রেয়ার লাইনে যোগ দিতে না-পারলে স্কুলে ঢুকতেন না। সটান বাড়ি ফিরে যেতেন।

    যমশেরপুর বিএন হাইস্কুলের প্রাক্তনী, ভারতীয় বায়ুসেনায় কর্মরত বিপ্লব বিশ্বাস বলছেন, ‘প্রকৃত অর্থেই সুহৃতোষ স্যর মানুষ গড়ার কারিগর। তিনি পাশে না-থাকলে অর্থাভাবে বহু ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যেত। আজ তাঁদের অনেকেই দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। আমি জীবনে যেটুকু যা করতে পেরেছি তা স্যরের জন্যই। আক্ষরিক অর্থেই এই পুরস্কারটা স্যর ডিজ়ার্ভ করেন।’ সুহৃতোষের এক সময়ের ছাত্র, অধুনা সহকর্মী, রসায়নের শিক্ষক অনির্বাণ মণ্ডলের কথায়, ‘একটি কঠিন বিষয়কেও কী ভাবে সহজ, প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় করে তুলতে হয় তা স্যরের কাছেই শিখেছি। সেই সময়েই স্যর বাইরে থেকে রংবেরঙের চক আনিয়ে স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে ব্যবহার করতেন। কোনও ছাত্র স্কুলে ক’দিন অনুপস্থিত থাকলে স্কুল ছুটির পরে তার বাড়ি চলে যেতেন। কী সমস্যা জেনে দ্রুত সমাধানও করে দিতেন।’

    অনির্বাণের সংযোজন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পরেও সীমান্ত ঘেঁষা প্রান্তিক জনপদ, করিমপুর নানা দিক থেকে অবহেলিত। আজও এখানে রেললাইন নেই। কিন্তু, শত প্রতিবন্ধকতা উজিয়েও এখানে প্রতিভাবান ও গুণী মানুষের অভাব নেই। কিন্তু, তাঁরা সব সময়ে যোগ্য সম্মান পান না। কোনও দয়া বা অনুগ্রহ নয়, সরকারের কাছে আমরা স্যরের যোগ্য সম্মানেরই আবেদন জানিয়েছি।’

    সোশ্যাল মিডিয়াতেও সেই দাবি ক্রমে জোরালো হচ্ছে। পেশায় স্কুল শিক্ষিকা, বহরমপুরের বাসিন্দা রুবি বিশ্বাস ফেসবুকে লিখেছেন, ‘খুব অল্প সময়ের জন্য স্যরকে পাওয়ার দিনগুলো আমার কাছে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মনে আছে, একাদশ-দ্বাদশের শেষ পিরিয়ডে বায়োলজি প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের সময়ে আমাদের খিদে পেয়ে যেত। স্যর নিজের টাকা দিয়ে আমাদের টিফিন খাওয়াতেন। জনপ্রিয়, সহজ-সরল মনের মানবিক শিক্ষক এই পুরস্কার পেলে দেশ, সমাজ সম্মানিত হবে।’

    আর প্রিয় পড়ুয়াদের এমন ‘পাগলামি’ দেখে বেশ বিড়ম্বনায় পড়েছেন সুহৃতোষ। বলছেন, ‘ছেলেমেয়েরা এ সব কী পাগলামি শুরু করেছে, বলুন তো! কোনও মানে হয়! এত ছাত্রছাত্রী আজও আমায় ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, খোঁজ-খবর রাখে— এটাই তো আমার শিক্ষক-জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে!’

    ‘স্যর’ যাই বলুন না কেন, এ যুগের ‘উদ্দালক’রা যে ধনুক ভাঙা পণ করেছেন!

  • Link to this news (এই সময়)