পাঁচ সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ধুকপুক। কবজিতে হাত দিয়ে পালস পাচ্ছিলেন না চিকিৎসক। কিছুক্ষণের জন্য ১১ বছরের কিশোরী দিশা ভৌমিককে মৃতই ধরে নিয়েছিলেন কাকদ্বীপ মহকুমা হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা। তারপর? যমে-চিকিৎসকে টানাটানি। কিশোরীর নাকে-মুখে অ্যাম্বুব্যাগ লাগানো হয় সঙ্গে সঙ্গে। রোগী যখন নিজে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারে না, এই যন্ত্রের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ফুসফুসে পৌঁছে দেওয়া হয় অক্সিজেন। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় সিপিআরও। চিকিৎসকের বুদ্ধির জোরে প্রাণে বেঁচেছে কিশোরীর।
এতকিছু যার জন্য তা মাঝারি মাপের কালাচ সাপ। তা যে কামড়েছে প্রথমটায় তা টেরই পায়নি বছর এগারোর কিশোরী। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কালাচের কামড়ই এমন। কালাচের বিষ দাঁত অত্যন্ত ছোটও এবং সূক্ষ্ম হওয়ায় টেরই পাওয়া যায় না। পিঁপড়ের কামড়ের মতো ব্যাথা। কিন্তু প্রভাব মারাত্মক। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপের বামনগর এলাকার বাসিন্দা দিশার তলপেটে ব্যথা হচ্ছিল। জেঠু-জেঠিমার কাছে থাকে সে। শারীরিক অস্বস্তি হওয়ায় প্রথমটায় স্কুলে যেতে চায়নি। ‘স্কুলে যাব না’ বায়না শুনে বাড়ির লোক ভেবেছিল নিছক জেদ। তবে খটকা লাগায় স্থানীয় কাকদ্বীপ মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে আসেন জেঠু।
ডা. মানবেন্দ্র হালদার সে সময় ছিলেন এমার্জেন্সিতে। রোগীকে দেখেই তাঁর সন্দেহ হয় ‘সাপের কামড়।’ ততক্ষণে শিবনেত্র হয়ে গিয়েছে রোগীর। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোতে শুরু করেছে। অ্যান্টি স্নেক ভেনম সিরাম চালু করে দেন ডা. হালদার। হাসপাতালের সুপার ডা. কৃষ্ণেন্দু রায় জানিয়েছেন, দুর্ধর্ষ কাজ করেছেন মানবেন্দ্র। কালাচের বিষ নিউরোটক্সিন। ফুসফুসের পেশিগুলোকে আক্রান্ত করেছিল। কিশোরীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন নেমে গিয়েছিল ৪২ শতাংশে। ডা. মানবেন্দ্র হালদার অনুরোধ করেন, “দ্রুত ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করুন।” কিন্তু ভেন্টিলেটরে ঢোকানোর আগেই বন্ধ হয়ে যায় হৃদস্পন্দন। কালাচের কামড়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে শ্বাসযন্ত্র। তীব্র হাইপক্সিয়ার কারণে বন্ধ হয়ে যায় ধুকপুক। তেমনটাই হয়েছিল দিশার। ডা. কৃষ্ণেন্দু রায়ের বক্তব্য, “এত কিছুর পরেও হাল ছাড়েননি মানবেন্দ্র।” কুড়ি ভায়াল এভিএস বা অ্যান্টি স্নেক ভেনাম সিরাম দেওয়ার পরে পরের দিনই রোগী চোখ পিটপিট। বিকেলে খোলা হয় ভেন্টিলেটর। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্থানান্তরিত করা হয় পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে। কাকদ্বীপ মহকুমা হাসপাতালের ডা. মানবেন্দ্র হালদারের ক্লিনিক্যাল আইয়ের তারিফ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।