আন্দোলনের আগুনটা ধিকিধিকি করে জ্বলতে শুরু করেছিল যন্তর মন্তরে। ধীরে ধীরে সে আগুনের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে দেশ জুড়ে। NEET প্রশ্ন ফাঁসের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা-সহ শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের একাধিক দাবিতে ককরোচের আন্দোলনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ দেয় দেশের সিংহভাগ জেন জ়ি। তাদের সমর্থন জানিয়ে এগিয়ে আসেন বহু সাধারণ মানুষও। দলীয় রঙ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলনের একটি কর্মসূচি ছিল ‘চলো সংসদ’। মূলত পড়ুয়া জ়েন জ়ি-দের এই আন্দোলনকে সিঁদুরে মেঘ হিসাবে দেখে নিয়ন্ত্রণে নামে দিল্লি পুলিশ। ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলনে পড়ুয়াদের উপর নির্বিচারে চলে লাঠি। ছিল কাঁদানে গ্যাস, জলকামানও। এমনকী আন্দোলনকারীদের রুখতে পেলেট গান থেকে ছররা চালানোরও অভিযোগ উঠেছে। শুধু দিল্লি নয়, জায়গায় জায়গা পড়ুয়াদের উপর পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ। বিহারের সিওয়ানে পড়ুয়াদের প্রতিবাদ মিছিলে AK-47 থেকে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। কী ঘটেছিল প্রতিবাদ মিছিলে যে এমন কড়া পদক্ষেপ? কোন পরিস্থিতি আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ বা গুলি চালাতে পারে পুলিশ? কী বলছে ভারতের আইন, আসুন জেনে নিই।
আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হলে বা প্রতিবাদ আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে উঠলে পুলিশ তা দমনে অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারে। অস্ত্র তখনই প্রয়োগের দরকার পড়ে, যখন আন্দোলনকারীদের হুঁশিয়ারি দেওয়া, লাঠি চার্জ বা টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটানোর পরেও গোলমাল বেড়ে যায় এবং তা থেকে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি বা গুরুতর জখম হওয়ার ও সরকারি সম্পত্তির যথেচ্ছ ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে থানার অস্ত্রাগার বা মালখানা থেকে অথবা রিজ়ার্ভ অফিস থেকে পুলিশ কর্মীদের বন্দুক ও গুলি বরাদ্দ করার ক্ষেত্রে কয়েকটি নিয়ম ও ধাপ রয়েছে। যেমন, দরকারে গুলি ছোড়ার অনুমতি নিতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে। তাঁর অবর্তমানে সেই অনুমতি দেবেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সিনিয়র মোস্ট পুলিশ অফিসার অথবা যে পুলিশ অফিসারের নেতৃত্বে ঘটনাস্থলে বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, সেই অফিসার।
ভারতীয় ফৌজদারি বিধির ১২৯ নম্বর ধারা বা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারায় কোনও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিংসাত্মক কাজকর্মে লিপ্ত থাকা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার অনুমতি দিতে পারেন। তাঁর অবর্তমানে গেজেটেড মর্যাদার কোনও পুলিশ অফিসার সেই নির্দেশ দিতে পারেন। তিনি অনুমতি দেবেন রিজ়ার্ভ অফিস বা থানার অস্ত্রাগার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি নেওয়ার।
সেই অনুমতি পাওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার সরকারি নথিতে যা যা লগ এন্ট্রি করবেন বা যা যা নথিভুক্ত করবেন, তা হলো:
মালখানা বা রিজ়ার্ভ অফিসের দায়িত্বে থাকা অফিসার থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের লগ এন্ট্রি দেখে বা ওয়্যারলেস বা টেলিফোনে নির্দেশ শুনে অস্ত্রাগারের দরজা বা আলমারি খুলবেন। তার পরে প্রতিটি অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্রের নম্বর, গুলির মাপ বা ধরন (কোন মাপের বা বোরের গুলি, গুলি রাইফেলের না রিভলভারের না পিস্তলের) বিস্তারিত ভাবে অস্ত্রাগারের রেজিস্ট্রিতে নথিভুক্ত করবেন। যিনি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি দিচ্ছেন, তাঁর ও যিনি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি নিচ্ছেন, দু’জনের সই থাকতে হবে নথিতে।
অস্ত্রাগার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি নিয়ে যে পুলিশ অফিসার তা ঘটনাস্থলের ডিউটিতে যাওয়া পুলিশ কর্মীদের মধ্যে বিলি করবেন, তিনি তাঁদের প্রত্যেককে গুলি ছোড়ার পরিস্থিতির সঠিক প্রয়োজনীয়তা বোঝাবেন এবং গুলি ছোড়ার স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর জানাবেন।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরে থানায় বা রিজার্ভ অফিসে ফিরে গিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলির ব্যবহারের ফিরিস্তি দিতে হবে প্রত্যেককে। অস্ত্র ও গুলি মিলিয়ে ফেরত নিয়ে ইনভেন্ট্রি বুকে তা লিখে রাখতে হবে।
যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হয়, জনতার হিংসাত্মক আচরণে মানুষের প্রাণ, সম্পত্তি বা সরকারি পরিকাঠামোর বড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয় এবং অন্য সব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তখন আইন অনুযায়ী বলপ্রয়োগ করা হতে পারে।
না। সাধারণভাবে সতর্কবার্তা, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস বা অন্যান্য কম ক্ষতিকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে শেষ বিকল্প হিসেবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাধারণত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে আইন অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ পুলিশ আধিকারিকও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারেন।
জরুরি পরিস্থিতির কারণ, কতজন পুলিশ মোতায়েন হচ্ছেন, কী ধরনের অস্ত্র ও কত রাউন্ড গুলি বরাদ্দ হচ্ছে এবং কোন পুলিশকর্মী সেই অস্ত্র গ্রহণ করছেন—এসব তথ্য সরকারি রেজিস্টারে নথিভুক্ত করা হয়।
অস্ত্রাগার বা রিজার্ভ অফিস থেকে অস্ত্র দেওয়ার সময় অস্ত্রের নম্বর, গুলির ধরন, গ্রহণকারী ও প্রদানকারীর স্বাক্ষরসহ সমস্ত তথ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হয়।
ডিউটি শেষে প্রত্যেক পুলিশকর্মীকে ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত গুলির হিসাব জমা দিতে হয়। অস্ত্র ও গুলি মিলিয়ে ইনভেন্টরি রেজিস্টারে নথিভুক্ত করে তা ফেরত নেওয়া হয়।
না। আইন অনুযায়ী পরিস্থিতির গুরুত্ব, হুমকির মাত্রা এবং নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (SOP) অনুসারেই বলপ্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।