শিলাদিত্য সাহা
সামনে সাক্ষাৎ বড়মা! মায়ের সঙ্গে মেয়েও। সুন্দরবনে পর্যটকদের কপালে এমন ‘ডাবল ডিলাইট’ কমই জোটে। গত নভেম্বরে বন্যপ্রাণের ছবি তুলতে গিয়ে সজনেখালির কাছে সুন্দরবনের বিখ্যাত বাঘিনি বড়মাকে মেয়ের সঙ্গে দেখে তাই আহ্লাদে আটখানা হয়ে গিয়েছিলেন সাত্যকি নাহা। কিন্তু ছবি তুলে ক্যামেরায় সেটা জ়ুম করে দেখতে গিয়েই মনটা ভারী হয়ে যায়। গরান–বাইন বনের ফাঁকে বসে থাকা বড়মার মেয়ের পায়ের কাছে একটা সফ্ট ড্রিঙ্কসের প্লাস্টিক বোতল। ছোট্ট বাঘিনি বুঝতেই পারছে না, ওটা খাওয়ার জিনিস, না খেলার! ঘাড় নামিয়ে মন দিয়ে সে দেখছে ছিপি আঁটা প্লাস্টিকের বোতলটা। ভুল করে ওটা সে খাওয়ার চেষ্টা করলে বা গলায় আটকে গেলে কী বিপত্তি হতে পারে, সেটা জন্ম থেকে জোয়ার–ভাটার সঙ্গে খেলে বেড়ে ওঠা সুন্দরবনের বাঘ জানে না।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে সেই ছবি সামনে আসতেই শোরগোল শুরু হয়েছে। তবে কি গত কয়েক বছরে মহারাষ্ট্রের তাডোবা, মধ্যপ্রদেশের পেঞ্চ বা রাজস্থানের রণথম্ভোরের জঙ্গলে যে ভাবে সাফারিতে অবিবেচক পর্যটকদের ফেলে আসা প্লাস্টিকের বোতল–ব্যাগ মুখে করে বাঘেদের ঘুরতে দেখা গিয়েছে, সেই দুশ্চিন্তার ট্রেন্ড এ বার সুন্দরবনেও? প্রশ্নটা এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক আরও, কারণ টাইগার সাফারির ক্ষেত্রে তাডোবা–পেঞ্চ বা রণথম্ভোরের মতো ‘ওভারক্রাউডেড’ পরিস্থিতি ম্যানগ্রোভে ঘেরা সুন্দরবনের নয়। যাঁরা আসেন, তাঁদেরও নদীর নির্দিষ্ট রুটের বাইরে লঞ্চে চেপে যত্রতত্র ঘোরার অধিকার নেই। তার পরেও কেন প্লাস্টিক দূষণের শিকার হবে বাদাবনের বাঘ? প্রশ্নের উত্তরে বেরিয়ে আসছে একাধিক সমস্যার কথা, যা শুধু পর্যটনকেন্দ্রিক নয়। বরং গত অনেক বছর ধরে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সরকারি উদাসীনতার অভিযোগ তুলে ধরছে।
তরুণ ফোটোগ্রাফারের কথায়, ‘এমনিতে সুন্দরবন টাইগার রিজ়ার্ভের কোর এরিয়ায় পর্যটকদের যেতে দেওয়া হয় না। কোর–বাফার–স্যাংচুয়ারি — এই তিন ভাগের মধ্যে বাফার আর অভয়ারণ্য এলাকার কিছুটা অংশে ইকো–ট্যুরিজ়ম চলে। আমরা গত নভেম্বরে সজনেখালির কাছে এমন একটা এলাকায় বড়মার মুখের সামনে প্লাস্টিকের বোতলটা দেখি। এমন পরিস্থিতি সুন্দরবনে দেখতে হবে ভাবিনি। হয়তো কেউ লঞ্চ থেকে ওটা ফেলে দিয়েছে, অথবা অন্য কোথাও থেকে ভাটার টানে ভেসে এসেছে।’
ঘটনা হলো, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় ‘সিঙ্গল ইউজ়ড’ প্লাস্টিকের কোনও প্যাকেট বা বোতল নিয়ে যাওয়া বারণ। কিন্তু গদখালি বা ঝড়খালির মতো সুন্দরবনের ‘এন্ট্রি’ পয়েন্টগুলোয় প্লাস্টিকের ব্যবহারে কোনও বাধা নেই। ফলে পর্যটক থেকে শুরু করে কয়েক লক্ষ স্থানীয় বাসিন্দা — সবাই দেদার প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার করেন। ইকো–ট্যুরিজ়ম এলাকায় পর্যটকদের লঞ্চ ঢোকার সময়েই সবার থেকে সিঙ্গল ইউজ়ড প্লাস্টিক নিয়ে নেওয়ার কথা। এমনকী লঞ্চেও প্লাস্টিকের দ্রব্য ফেলার বিন বক্স থাকে। তার পরেও যদি জলে প্লাস্টিক ভাসতে দেখা যায়, তা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে সব লঞ্চকে। যদিও পর্যটক বা ট্যুর অপারেটররা সব নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মানছেন — বাস্তব পরিস্থিতি সে কথা বলে না।
এর বাইরেও একটা বড় সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছেন রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাঁও। মন্ত্রীর কথায়, ‘সুন্দরবনে দ্বীপ এলাকায় অজস্র গ্রাম আছে যা একমাত্র নদীপথে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। প্রচুর মানুষজন থাকেন। পাখিরালয়ের মতো কিছু এলাকা তো বর্ধিষ্ণু। কিন্তু বিগত সরকার কোনওদিন এইসব এলাকায় সুসংহত ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ গড়ে তোলেনি। ওখানকার প্রান্তিক জনপদেও এখন দৈনন্দিন প্রয়োজনে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। তাঁদের ফেলা বর্জ্য উপযুক্ত প্রক্রিয়াকরণের অভাবে বাদাবনের জোয়ার–ভাটায় ভেসে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সুন্দরবনের মতো ‘ফ্র্যাজাইল ইকোসিস্টেম’ এতে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেটা এতদিন ভাবাই হয়নি।’
তা হলে উপায়? গত এক–দেড় বছরে বন দপ্তরের কর্মীরাও বাদাবনের অভয়ারণ্য এলাকার জলে–ডাঙায় পড়ে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য সরাতে আগের মতো সক্রিয়তা দেখাননি বলে স্থানীয়দের একাংশের দাবি। সুন্দরবন টাইগার রিজ়ার্ভের ফিল্ড ডিরেক্টর রাজেন্দ্র জাখরকে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি, উত্তর দেননি মেসেজেরও। যদিও বাস্তব সমস্যা মেনে বনমন্ত্রীর জবাব, ‘সিঙ্গল ইউজ়ড প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনে জরিমানার ব্যবস্থা আছে, প্রয়োজনে তা আরও কঠোর ভাবে প্রয়োগ করা হবে। পর্যটকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বন দপ্তরে কর্মীর সঙ্কট রয়েছে। তার পরেও সবাই বাঘের জঙ্গল, পরিবেশ রক্ষায় সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। এর পাশাপাশি সুন্দরবনের দ্বীপ এলাকার জনপদের বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা দরকার। সেই নিয়ে আলোচনা হবে।’