অনির্বাণ ঘোষ
যাদের উপরে ভরসা করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নৈতিকতা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, নিয়মভঙ্গের অভিযোগ উঠল তাদের বিরুদ্ধেই। গুরুতর অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার অভিযোগে দেশের সাতটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এথিক্স কমিটির রেজিস্ট্রেশন বাতিল করল কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজ়েশন (সিডিএসসিও)। বাতিল হওয়া সাতটি কমিটির দু'টি কলকাতার।
সিডিএসসিও-র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০১৯-এর 'নিউ ড্রাগস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস (এনডিসিটি) রুলস'–এর অধীন 'গুড ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস' (জিসিপি) নির্দেশিকা এবং অন্য বিধি মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পরিদর্শন চালানো হয়। ট্রায়ালে ঝুঁকি পরখের সেই পরিদর্শনে সাতটি এথিক্স কমিটির ক্ষেত্রে গুরুতর ত্রুটি, নিয়মভঙ্গ এবং যথাযথ দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার প্রমাণ মেলে। শো-কজ় নোটিস, ব্যক্তিগত শুনানির মতো সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই রেজিস্ট্রেশন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাতিল কমিটিগুলির মধ্যে রয়েছে কলকাতার যাদবপুরের হিউরিপ ইন্ডিপেন্ডেন্ট বায়ো–এথিক্স কমিটি এবং ডক্টর টিকে পাল মেমোরিয়াল বায়ো–এথিক্স কমিটি। দিল্লি, নবি মুম্বই, আমেদাবাদ ও পুনের আরও পাঁচটি এথিক্স কমিটির বিরুদ্ধেও একই পদক্ষেপ করা হয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানার জন্য যাদবপুরের দুই এথিক্স কমিটির অভিন্ন শীর্ষ নেতৃত্ব ভাস্বতী পালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন নিরুত্তর থেকেছে, জবাব মেলেনি মেসেজেরও।
ক্লিনিক্যাল রিসার্চ বিশেষজ্ঞ স্নেহেন্দু কোনারের বক্তব্য, 'এতগুলি এথিক্স কমিটির রেজিস্ট্রেশন খারিজের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর কথায়, 'ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা, সুস্থতা ও মর্যাদা রক্ষা এথিক্স কমিটির প্রধান দায়িত্ব। কোনও নতুন ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা-সরঞ্জাম বা গবেষণাধীন পণ্যের ট্রায়াল শুরুর আগে গবেষণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুফল, অংশগ্রহণকারীর সম্মতি এবং সামগ্রিক নৈতিক দিক খতিয়ে দেখে ট্রায়ালের অনুমোদন দেয় এই কমিটি।' বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যে প্রতিষ্ঠান নৈতিকতা রক্ষা ও তদারকির দায়িত্বে, তাদের বিরুদ্ধেই যদি নৈতিকতা ও নিয়মভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তা হলে ভয়ঙ্কর। স্নেহেন্দুর মতে, 'সিডিএসসিও-র এই পদক্ষেপ দেশের সব এথিক্স কমিটির কাছেই বার্তা।'
'ফোরাম ফর এথিক্স রিভিউ কমিটি অফ ইন্ডিয়া'র ভাইস প্রেসিডেন্ট, ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজির প্রবীণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শান্তনু ত্রিপাঠি বলেন, 'এথিক্স কমিটির নানাবিধ অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছে মূলত তিন রকম সমস্যা। এক, কমিটির সদস্যদের নিজেদের ভূমিকা সম্বন্ধে যথাযথ জ্ঞানের অভাব। তাই নিয়মিত ট্রেনিং দরকার। দুই, যে প্রতিষ্ঠানে কমিটি কাজ করছে, তাদের তরফে কমিটির জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধের বন্দোবস্তে চরম অনীহা। এবং তিন, যা সবচেয়ে আপত্তিকর— এথিক্স কমিটির পক্ষে সচেতন বা অসচেতন ভাবে স্বার্থের সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়া।' তিনি মনে করেন, এই সব বিষয়গুলি সিডিএসসিও-র মতো সংস্থার নিয়মিত পর্যবেক্ষণেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।