এই সময়: সাত বছরের অপেক্ষার অবসান, অভিনব ‘প্রস্তুতি’র পরে হৃদযন্ত্রে সাড়ে চার ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারে সুস্থ হলো খুদে।
জন্ম থেকেই বিরল জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত ছিল সাত বছরের আয়েশা মল্লিক (নাম পরিবর্তিত)। সাধারণত জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যে অস্ত্রোপচার করা প্রয়োজন, তার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ পরিকল্পনা, অভিনব চিকিৎসা পদ্ধতি এবং শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দীর্ঘ সময়ের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেন বিএম বিড়লা হার্ট হাসপাতালের চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসকদের বক্তব্য, শিশুটি ‘ট্রান্সপজ়িশন অফ দ্য গ্রেট আর্টারিজ়’ (টিজিএ) নামে জটিল জন্মগত হৃদরোগে ভুগছিল। ওই রোগে হৃদযন্ত্র থেকে বেরনো দু’টি প্রধান ধমনি পরস্পর উল্টো অবস্থানে থাকে। ফলে, শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছয় না। আট মাস বয়সে তার একটি অস্ত্রোপচার (সেনিং) করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করা হলেও চূড়ান্ত সংশোধনী অস্ত্রোপচার তখন সম্ভব হয়নি।
বছর দুয়েক আগে আলিপুরের ওই বেসরকারি হার্ট হাসপাতালে আসা শিশুটির বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জেন কুন্তল রায়চৌধুরী ও পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়োলজিস্ট শ্যামজিৎ সমাদ্দার। পরীক্ষায় দেখা যায়, চূড়ান্ত অস্ত্রোপচারের চাপ নেওয়ার জন্য তখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বাঁ দিকের ভেন্ট্রিকল। অতঃপর চিকিৎসকরা অভিনব সিদ্ধান্ত নেন। ডায়ালিসিস রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত আর্টেরিওভেনাস (এভি) ফিশচুলা শিশুটির বাঁ কনুইয়ে তৈরি করা হয়, যাতে হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দুর্বল ভেন্ট্রিকলকে ধাপে ধাপে শক্তিশালী করা যায়।
এক বছর ধরে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হওয়ায় চূড়ান্ত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাড়ে চার ঘণ্টার ওই জটিল অস্ত্রোপচারে হৃদযন্ত্র সাময়িক ভাবে বন্ধ রেখে মহাধমনি ও ফুসফুসীয় ধমনি— এই প্রধান দুই ধমনিকে স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়। অস্ত্রোপচারে প্রধান দুই চিকিৎসক কুন্তল ও শ্যামজিতের পাশাপাশি ছিলেন কার্ডিয়াক অ্যানাস্থেশিয়ার প্রধান চিকিৎসক প্রবীরকুমার দাস ও পারফিউশন টিমের প্রধান সুধাকর রাও।
অস্ত্রোপচারের পরে পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়োলজিস্ট শতরূপা মুখোপাধ্যায় ও পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক আইসিইউ দলের নিবিড় পরিচর্যায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাত বছরের মেয়েটির ভেন্টিলেটর খুলে দেওয়া সম্ভব হয়। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে সে ছাড়া পেয়েছে ১০ দিনের মধ্যেই। চিকিৎসক কুন্তলের কথায়, ‘নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সঠিক পরিকল্পনা, ধাপে ধাপে প্রস্তুতি এবং বহু–বিভাগীয় সমন্বয়ে অনেক ক্ষেত্রেই এমন জটিল জন্মগত হৃদরোগের সফল চিকিৎসা সম্ভব।’