• ১২.৮৬ কোটির ক্ষতি বুঝেও জমি দেয় মমতা সরকার, ক্যাগ রিপোর্টে সামনে এল অনিয়ম
    এই সময় | ২৮ জুলাই ২০২৬
  • এই সময়: কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ) সামনে আনল নদিয়ার হরিণঘাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত ক্ষতির হিসেবও। ওই শিল্পতালুকে ই-কমার্স সংস্থা ফ্লিপকার্টের লজিস্টিক শাখা ইনস্টাকার্ট সার্ভিসেসকে জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগমের ১২.৮৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ তুলেছে ক্যাগ।

    ২০২৩-এর ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের উপরে ভিত্তি করে ২০২৪–এর পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিংস সংক্রান্ত এই রিপোর্ট তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় হিসেব পরীক্ষক সংস্থাটি। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, হরিণঘাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে জমির বেস প্রাইস নির্ধারণের সময়ে প্রকল্প এলাকার বড় জলাশয়গুলিকে বরাদ্দযোগ্য জমির হিসেব থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। অথচ পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগমের নিজস্ব মূল্য নির্ধারণ নীতিতেই স্পষ্ট বলা রয়েছে, শিল্পের জন্য ব্যবহারযোগ্য বা বরাদ্দ করা যায় এমন জমির উপরে ভিত্তি করেই প্রতি একরের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এই নীতি অনুসরণ না করার কারণে নিগমের ১২.৮৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে ক্যাগ।

    ক্যাগ জানিয়েছে, ২০১৭-র অগস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার শিল্প গড়ার লক্ষ্যে ১,৩২৬.৯৩ একর জমি শিল্পোন্নয়ন নিগমের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেপ্টেম্বরেই হরিণঘাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের জন্য ৩৫৮.১৯ একর জমি অধিগ্রহণ করতে ২০৬.৭৩ কোটি টাকা অনুমোদন করে রাজ্য। ২০১৮-র মার্চে সেই অর্থ ভূমি ও ভূমি সংস্কার এবং উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরকে দেওয়া হয়। অক্টোবরে শিল্পোন্নয়ন নিগম জমির দখল নেয়।

    ওই বছরের অগস্টে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী সংস্থাগুলির কাছ থেকে ইচ্ছেপত্র চাওয়া হয়। সেখানে ৯৯ বছরের লিজ়ের জন্য প্রতি একর জমির দাম ধার্য করা হয় ৬৩.৪৯ লক্ষ টাকা। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ইনস্টাকার্ট সার্ভিসেস ৯৯১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি আঞ্চলিক ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়ে ১০৭.৩৫ একর জমির জন্য আবেদন করে। ২০১৮-র অক্টোবরে নিগমের পরিচালন পর্ষদ এবং ডিসেম্বরে রাজ্য মন্ত্রিসভা সেই প্রস্তাবে সবুজসঙ্কেত দেয়।

    ২০১৯-এর জানুয়ারিতে ৬৮.১৬ কোটি টাকায় ইনস্টাকার্ট সার্ভিসেসকে জমি বরাদ্দ এবং এপ্রিলে মালিকানা হস্তান্তর করা হয়। পরে ২০২০-তে আরও ১.৭৭ একর জমি ১.০৭ কোটি টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয় সংস্থাটিকে। সব মিলিয়ে ১০৯.১২ একর জমির জন্য ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে ৯৯ বছরের লিজ় চুক্তি করে দুই পক্ষ। বর্তমানে এখানেই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফুলফিলমেন্ট সেন্টাররয়েছে ফ্লিপকার্টের।

    ২০২২-এর ডিসেম্বরে নথি পরীক্ষা করতে ক্যাগ দেখতে পায়, হরিণঘাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মোট ৩৫৮.১৯ একর জমির মধ্যে ৫৫.৮৯ একরই জলাশয়, যা শিল্পের জন্য ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলে প্রকৃত বরাদ্দযোগ্য জমির পরিমাণ ৩০২.২৯৯৯ একরে দাঁড়ায়। কিন্তু, জমির বেস প্রাইস নির্ধারণের সময়ে পুরো ৩৫৮.১৯ একরকেই গণনায় ধরা হয়েছিল। ক্যাগ জানিয়েছে, শিল্পোন্নয়ন নিগমের নিজস্ব নীতি অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণের খরচের সঙ্গে ১০ শতাংশ প্রশাসনিক খরচ যোগ করে তা শুধুমাত্র বরাদ্দযোগ্য জমির উপরে ভাগ করে বেস প্রাইস নির্ধারণ করা উচিত ছিল। সেই হিসেব অনুযায়ী, প্রতি একর জমির দাম ৭৫.২৩ লক্ষ টাকা হওয়ার কথা ছিল। অথচ নেওয়া হচ্ছে ৬৩.৪৯ লক্ষ টাকা।

    ক্যাগের হিসেব অনুযায়ী, ১০৯.১২ একর জমির জন্য ইনস্টাকার্ট-এর কাছ থেকে মোট ৮২.০৯ কোটি টাকা লিজ় প্রিমিয়াম আদায় হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে আদায় করা হয়েছে মাত্র ৬৯.২৩ কোটি টাকা। ফলে ১২.৮৬ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি বা ক্ষতি হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

    ২০২৩-এর মে মাসে রাজ্য সরকার ক্যাগ-কে জানায়, শিল্পোন্নয়ন নিগমের পরিচালন পর্ষদ বিস্তারিত আলোচনার পরেই ২০১৮-র জুলাইয়ে প্রতি একরের বেস প্রাইস ৬৩.৪৯ লক্ষ টাকা স্থির করা হয়। সেই দামেই জমি বরাদ্দে সম্মতি দেয় রাজ্য মন্ত্রিসভাও। তবে রাজ্যের দেওয়া ব্যাখ্যা মানেনি ক্যাগ।

  • Link to this news (এই সময়)