বর্ষা এলেই যেন একই ছবির পুণরাবৃত্তি। একের পর এক ভূমিধসে বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে সিকিম ও কালিম্পংয়ের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ। দু’দিন পরপর ধসের ঘটনায় ফের প্রশ্নের মুখে জাতীয় সড়ক ১০ (NH-10)। বহু বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন আরও বড় বিপদের মুখে পড়তে পারে। তাই বিকল্প হিসেবে তৈরি হচ্ছে জাতীয় সড়ক ৭১৭ (NH-717)। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—প্রকৃতির সামনে কি শেষ পর্যন্ত হার মানবে প্রযুক্তি, নাকি বিজ্ঞানই দেখাতে পারে নতুন পথ?
NH-10 শুধুমাত্র একটি রাস্তা নয়, উত্তরবঙ্গ, কালিম্পং ও সিকিমের অর্থনীতি, পর্যটন, বাণিজ্য এবং নিত্যদিনের জীবনযাত্রার অন্যতম ভরসা। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক, পণ্যবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী গাড়ি এবং জরুরি পরিষেবার যানবাহন এই পথেই যাতায়াত করে। ফলে এই একটি রাস্তার উপর অত্যধিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প সড়ক নির্মাণ অবশ্যই জরুরি, তবে শুধুমাত্র নতুন রাস্তা তৈরি করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে অতিবৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে নদীর ধারণক্ষমতা বাড়ানো, পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নদী ব্যবস্থাপনা করলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই NH-10-কে রক্ষা করতে হলে শুধু জরুরি মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারও প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও ফলিত ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ইন্দ্রজিৎ রায়চৌধুরী জানান, “NH-10 আজকের রাস্তা নয়, বহু দশক ধরে এটি শিলিগুড়ির সঙ্গে সিকিমের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম। তাই এর উপর স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর চাপ পড়ছে। বিকল্প রাস্তা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই সঙ্গে শুষ্ক সময়ে তিস্তা নদীর তলদেশে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পলি বা সিল্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপসারণ করা জরুরি। এতে নদীর গভীরতা ও জল বহন ক্ষমতা বাড়বে, ফলে বর্ষাকালে নদীর জল দুকূল ছাপিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও অনেকটাই কমবে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ অনেকাংশে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এর ফলে নদীতে দ্রুত পলি জমছে এবং নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে। অতিবৃষ্টির সময় সেই জল আর নদীর মধ্যে ধরে রাখা সম্ভব হয় না, ফলে নদী উপচে NH-10-সহ আশপাশের এলাকায় বিপর্যয় তৈরি করে। তাই শুধুমাত্র বিকল্প জাতীয় সড়ক নির্মাণ নয়, নদী ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ড্রেজিং, প্রকৌশলভিত্তিক পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক উদ্যোগ—সবকিছুকে সমন্বয় করেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের এই বিশ্লেষণ নতুন করে ভাবাচ্ছে প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ সকলকেই। NH-717 ভবিষ্যতে বিকল্প যোগাযোগের বড় ভরসা হয়ে উঠলেও, উত্তরবঙ্গ ও সিকিমের এই ঐতিহাসিক লাইফলাইন NH-10-কে টিকিয়ে রাখতে এখনই বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে আগামীদিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেই মত সংশ্লিষ্ট মহলের।