এই সময়, নয়াদিল্লি: রাজপথের সংঘাতের রেশ এ বার সংসদে! দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘নিট’–প্রতিবাদীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ বেধেছিল রাজধানীর পুলিশ–প্রশাসনের, আর সেই প্রশ্নফাঁস রোধে আনা কেন্দ্রের বিল নিয়ে মঙ্গলবার লোকসভায় বাগযুদ্ধ তুঙ্গে উঠল শাসক বিজেপি বনাম বিরোধী শিবিরের সাংসদদের!
টানা ছ’দিন অচলাবস্থা চলার পরে মঙ্গলবার অবশেষে কিছুটা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরল লোকসভা৷ প্রথম দফায় একপ্রস্ত মুলতুবির পরে মঙ্গলবার দুপুর ২টো নাগাদ লোকসভায় প্রশ্নফাঁস রুখতে ‘পাবলিক এগজ়ামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস), ২০২৬’ সংশোধনী বিল নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। তবে শুরু থেকেই শাসক ও বিরোধী শিবিরের সংঘাত তুঙ্গে ওঠে, যা গড়াল রাত পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে শাসক পক্ষ হাতিয়ার করেছে কেন্দ্রে এনডিএ এবং বিরোধী শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে প্রশ্নফাঁসের ঘটনাগুলিকে আর বিরোধীরা অস্ত্র করল আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের উপরে পুলিশের লাঠিচার্জের অভিযোগকে।
দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য আনা এই বিল নিয়ে আলোচনার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় উপস্থিত নেই কেন— প্রশ্ন তোলেন কংগ্রেস সাংসদ কেসি বেণুগোপাল৷ জবাবে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা জানান, সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রীরা সভায় উপস্থিত আছেন, ফলে সংসদীয় রীতি অনুযায়ী আলোচনা শুরু করতে কোনও বাধা নেই৷ এর পরেই সরকারের তরফে বিরোধী শিবিরকে প্রথম নিশানা করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং৷ কংগ্রেস তথা ইউপিএ সরকারের আমলে কোন কোন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল, তার তালিকা তুলে ধরেন জিতেন্দ্র৷ তাঁর দাবি, ২০০৯–এ রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ড, ২০১১-র অল ইন্ডিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ট্রান্স এগজ়াম, ২০১২–এর এইমস এন্ট্রান্স, ২০১৩-র মহারাষ্ট্র সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছিল। এ ছাড়া, ২০১০-এ উত্তরপ্রদেশের বিএড প্রবেশিকা, ২০১২–তে তামিলনাড়ুর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা, ২০০৯–এ পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্সের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। জিতেন্দ্র মনে করিয়ে দেন, ‘২০১৭–তে এনডিএ সরকার ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) তৈরি করেছে ঠিকই, তবে কংগ্রেসই ১৯৯২–এ এনটিএ তৈরির সুপারিশ করেছিল। ২০১০–এ ইউপিএ জমানায় একটি কমিটি এনটিএ তৈরিরই সুপারিশ করেছিল।’
পাল্টা বলতে উঠে বিরোধী শিবিরের তরফে কেন্দ্রকে নিশানা করেন সমাজবাদী পার্টির সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব, কংগ্রেসের রাহুল, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীরা৷ তবে এ দিন বিরোধীদের কথায় প্রশ্নফাঁসের থেকেও বেশি উঠে এসেছে বিক্ষোভকারী পড়ুয়াদের উপরে পুলিশি লাঠিচার্জের প্রসঙ্গ। অখিলেশ বলেন, ‘সরকার ভয় পেয়েছিল। তাই শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে৷ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান৷’ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘জরুরি অবস্থা’র সঙ্গে তুলনা করে সপা–প্রধানের দাবি, ‘আমি নিজে জরুরি অবস্থার সাক্ষী ছিলাম না। কিন্তু এখন দিল্লিতে যা ঘটছে, তাতে জরুরি অবস্থার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি।’ অখিলেশের মতে, পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য আইনের প্রয়োজন নেই, দরকার সরকারের সৎ মানসিকতা, তা হলেই পরীক্ষা পদ্ধতি স্বচ্ছ হয়ে যাবে!
সোমবার সংসদের মকর দ্বারের সামনে পদত্যাগী শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে হিরোর মতো সংবর্ধনা দিয়েছিলেন এনডিএ সাংসদরা। সেই ঘটনার উল্লেখ করে এ দিন মোদী সরকারকে নিশানা করেন ওয়েনাড়ের কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। প্রশ্ন তোলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান কি সুপারম্যান?’ প্রতিবাদী পড়ুয়াদের উপরে দিল্লি পুলিশের লাঠিচার্জের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর প্রশ্ন, ‘আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের উপরে লাঠি চালানো, পেলেট ছোড়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দিয়েছিলেন?’ নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশীকে বিঁধেও আক্রমণ শাণিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। সেটাকে ‘আপত্তিকর’ বলে শাসক শিবির সরব হলে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয় প্রিয়াঙ্কার সেই মন্তব্য।
এ দিন লোকসভায় বক্তব্য পেশ করেন তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও৷ তিনি বক্তব্য শুরু করা মাত্রই ট্রেজ়ারি বেঞ্চে বসা বিজেপি সাংসদ সতীশ গৌতম, সঞ্জয় আগরওয়াল, সৌমিত্র খানরা বাংলার নিয়োগ দুর্নীতি এবং সিন্ডিকেট রাজের প্রসঙ্গ তুলে চিৎকার করতে থাকেন৷ তখন অভিষেকের সমর্থনে রুখে দাঁড়ান কালীঘাটপন্থী তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র৷ প্যানেল চেয়ারপার্সনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মহুয়া বলেন, ‘ওঁদের থামতে বলুন। দেখুন, আদতে কারা আলোচনা চান না! ওঁরা ডিসটার্ব করছেন!’ প্যানেল চেয়ারপার্সন দিলীপ সইকিয়া বিজেপি সাংসদদের থামানোর পরে অভিষেক বলেন, ‘২০২৪-এ বিল এনে এখনই সংশোধনী আনতে হচ্ছে। এটা লজ্জার! পরীক্ষার্থীরা স্বচ্ছতা চান। বিল কোনও সমাধান নয়। এই সংশোধনী বিলই বুঝিয়ে দিচ্ছে, এনডিএ ব্যর্থ হয়েছে!’ অভিষেকের প্রশ্ন, ‘সরকার কেন প্রশ্নফাঁস রুখতে পারে না? যদি প্রশ্নপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য সেনার হেলিকপ্টার প্রয়োজন হয়, তা হলে দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো বুঝে দেখুন!’ কেন্দ্রের প্রস্তাবিত প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী বিলকে সমর্থন জানালেও অভিষেকের কটাক্ষ, ‘বিজেপি নিজেই আগুন লাগিয়েছে। এখন ওই আগুন নিজেরাই নেভানোর চেষ্টা করছে। সরকার এখন বিল আনছে। তাতে হয়তো দোষীদের শাস্তি হতে পারে, কিন্তু প্রশ্নফাঁসে পড়ুয়ারা যে মানসিক ধাক্কা খেয়েছেন, সেটা ঠিক হবে কী করে? যে স্বপ্নগুলো ভেঙে গিয়েছে, সেগুলো ঠিক করবেন কী করে?’
বিরোধীদের সম্মিলিত আক্রমণের জবাবে বিজেপি সাংসদ বাঁশুরি স্বরাজও ইউপিএ সরকারের আমলে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, ‘বিরোধীরা এমন একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা করছেন যেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ২০১৪–তে এনডিএ কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পরেই শুরু হয়েছে। এটা পুরোপুরি ভুল! ২০০৪ থেকে ২০১৪–এর মধ্যে ইউপিএ এবং তাদের সহযোগীদের শাসিত রাজ্যগুলিতে ২২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে ৬টি তৎকালীন ইউপিএ সরকারের আয়োজিত পরীক্ষা ছিল। তার জবাবদিহি কে করবে?’