শিলাদিত্য সাহা
এ যেন সাপ–লুডো খেলায় একেবারে মাথায় পৌঁছে আচমকা সাপের মুখে পড়ে যাওয়া!
২০২৬ সালটা যে কোনও দিক থেকেই মধ্যপ্রদেশের বন দপ্তরের জন্য রেকর্ড জড়ার বছর। ২০২২–এ হওয়া দেশব্যাপী বাঘশুমারিতে কমপক্ষে ৭৮৫টি বাঘ জঙ্গলে নিয়ে ভারতের টাইগার ক্যাপিটাল তকমা পেয়েছিল মধ্যপ্রদেশ। চার বছরের মাথায় আবার বাঘশুমারি চলছে দেশজুড়ে। এ বার সংখ্যাটা স্বাভাবিক নিয়মে হাজার পার করলে মধ্যপ্রদেশই হবে দেশের প্রথম রাজ্য, যেখানে হাজারটা বাঘ আছে। কিন্তু তার আগেই যে সাপের মুখে পড়েছেন বনকর্তারা। কারণ রাজ্যের বিভিন্ন বাঘের জঙ্গল তো বটেই, তার বাইরেও পরের পর বাঘের মৃত্যুতে প্রবল বিতর্ক শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। টাইগার ক্যাপিটাল মধ্যপ্রদেশে ২০২৬–এর ১ জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত — অর্থাৎ বছরের প্রথম সাত মাস কাটার আগেই মারা গিয়েছে অন্তত ৪১টি বাঘ! ২০২৫–এ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মধ্যপ্রদেশে ৫৬টি বাঘের মৃত্যুর পরে বনকর্তারা আশ্বাস দিয়েছিলেন, জঙ্গলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। অথচ তার পরে শুধু বাঘের মৃত্যুর হার বেড়েছে এমন নয়, মৃত্যুর পিছনে চোরাশিকার, কুসংস্কার, বিষপ্রয়োগের মতো কারণ সামনে এসেছে।
কেন মরছে এত বাঘ? মধ্যপ্রদেশের ক্ষেত্রে একটু কারণগুলো দেখা যাক।
বেআইনি বিদ্যুতের তারে তড়িদাহত হয়ে মৃত্যু: সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাবলী থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৮০% বাঘেরই মৃত্যু হয়েছে সংরক্ষিত অভয়ারণ্য এলাকার বাইরে। জঙ্গলের আশপাশে চাষাবাদের এলাকায় কৃষকরা বুনো শুয়োরের হামলা থেকে ফসল বাঁচাতে বেআইনি ভাবে হাই ভোল্টেজ বিদ্যুতের তার পেতে দিচ্ছেন জমির আশপাশে। আর জঙ্গল থেকে বাইরে আসা বাঘ সেই লাইভ ওয়্যারে পা দিতেই খেল খতম! বিদ্যুতের হুকিং তার যে শুধু কৃষকদের একাংশ পাতছেন এমন নয়, পাতছে চোরাশিকারিরাও।
জঙ্গলে স্থান সঙ্কুলান ও এলাকা দখলের লড়াই: রাজ্যের ৯টি বাঘের জঙ্গলে (কানহা, বান্ধবগড়, পেঞ্চ, সাতপুরা, পান্না, সঞ্জয়-দুবরি, রাতাপানি, বীরাঙ্গনা দুর্গাবতী, মাধব) হাজারের কাছাকাছি বাঘ থাকা যতটা গর্বের, জঙ্গলের নিয়ম অনুযায়ী ততটাই চিন্তার। কারণ জঙ্গলে বাঘ বাড়ার সঙ্গেই এলাকা দখলের লড়াইও বাড়ছে। সেই যুদ্ধে মারা পড়ছে বাঘ, কখনও মারাত্মক জখমও হচ্ছে। বনের বয়স্ক বাঘ তুলনায় তরুণদের তাড়া খেয়ে বেরিয়ে আসছে বাফার এলাকায়, বা অন্য জঙ্গলে শিকার ও নিরাপদ বাসার খোঁজে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাতেও মানুষ–বাঘ সংঘাত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এর সুযোগ নিচ্ছে চোরাশিকারিরাও।
ক্যানাইন ডিস্টেম্পার রোগ: কানহা টাইগার রিজ়ার্ভে মাসকয়েক আগে পাঁচটি বাঘের মৃত্যুর পিছনে এই মারণ ভাইরাসের উপস্থিতির কথা জানা যায়। মূলত রাস্তার কুকুর থেকে সংক্রমিত এই ভাইরাস যাতে দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে, তার জন্য ভ্যাক্সিন নিয়ে বন দপ্তরকে সক্রিয় হতে বলেছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। কিন্তু তাতেও চিন্তা যাচ্ছে না। কারণ জঙ্গলের বাইরে বাঘের শিকারযোগ্য প্রাণীর মধ্যে কুকুর বা গবাদি পশুই পড়ে। শিকার করা প্রাণীর শরীরে যদি এই ভাইরাস থাকে, তা হলে তার মাংস খেয়ে বাঘের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকেই। তার উপরে সংরক্ষিত অরণ্যের বাইরে বাঘের উপরে নজরদারি করাও সহজ নয়।
বিষপ্রয়োগ: গত এক মাসে পান্না টাইগার রিজ়ার্ভে একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে জঙ্গল ঘেঁষা এলাকায় মোষের গায়ে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিষ মাখিয়ে রাখা হয়েছে এবং সেই মোষ শিকার করে মাংস খাওয়ার পরে বাঘও মারা গিয়েছে। যে যে এলাকায় বাঘ–মানুষ সংঘাত পরিস্থিতি রীতিমতো জটিল আকার নিয়েছে, সেখানে শিকারযোগ্য গবাদি পশুর শরীরে বিষ মাখিয়ে রাখার ঘটনা সামনে আসছে।
চোরাশিকার: কোথাও জঙ্গলের কোর এরিয়ায় হরিণের শরীরে গুলি, কোথাও বাঘ মেরে তার চামড়া ও দেহাংশ নিয়ে বাকি শরীর জঙ্গলে জ্বালিয়ে দেওয়া কিংবা মাটি খুঁড়ে রীতিমতো কবর দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বন্যপ্রাণ নিয়ে কাজ করা একাধিক সংগঠন প্রশ্ন তুলেছে, বাঘের নিরাপত্তায় বিশেষ স্ট্রাইক ফোর্স থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রদেশে কী ভাবে চোরাশিকারিদের দাপট অব্যাহত রয়েছে? কুসংস্কারের বশে বাঘ শিকারের অভিযোগও উঠেছে। যদিও কারা এমন কাজে যুক্ত, স্পষ্ট হয়নি এখনও।