আমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার AI-171 বিমানের ভয়াবহ দুর্ঘটনার তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বুধবার রাজ্যসভায় কেন্দ্র জানিয়েছে, বিমানের ইঞ্জিনের ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে কোনও অস্বাভাবিকতা বা যান্ত্রিক ত্রুটি পাওয়া যায়নি। তবে গোটা থ্রাস্ট কন্ট্রোল মডিউলের পরীক্ষা এখনও চলছে এবং তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ পেতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
রাজ্যসভায় প্রশ্নের জবাবে অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী মুরলীধর মোহল জানান, ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচের লকিং সিস্টেম-সহ গোটা ব্যবস্থার কাঠামো পরীক্ষা করা হয়েছে। সেই পরীক্ষায় কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি।
বিমানটির নির্মাতা সংস্থা Boeing-এর মূল সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক (OEM)-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের পরীক্ষা করা হয়। তবে গোটা থাস্ট্র কন্ট্রোল মডিউল-এর আরও বিস্তারিত পরীক্ষা এখনও আমেরিকার সিয়াটেলে চলছে।
২০২৫ সালের ১২ জুন, আমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইকের উদ্দেশে রওনা হয় এয়ার ইন্ডিয়া-র Boeing 787-8 Dreamliner AI-171। টেকঅফের মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মেঘানিনগরের মেডিক্যাল কলেজের হস্টেল ভেঙে পড়ে।
বিমানটিতে থাকা ২৪২ জনের মধ্যে ২৪১ জনের মৃত্যু হয়। বিমানটি ক্র্যাশ করার পরে তাতে আগুন লেগে যায়। তাতে আরও ১৯ জনের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ দুর্ঘটনায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬০। মাত্র একজন যাত্রী জীবিত অবস্থায় বিমান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার পরে বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরোর (AAIB)-এর প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, টেক-অফের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিমানের দুই ইঞ্জিনের ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ 'RUN' থেকে 'CUTOFF' অবস্থানে চলে গিয়েছিল। এর ফলে দুই ইঞ্জিনেই জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং বিমান দ্রুত শক্তি হারাতে শুরু করে।
ফ্লাইট রেকর্ডারের তথ্য অনুযায়ী, দুটি সুইচ প্রায় এক সেকেন্ডের ব্যবধানে CUTOFF অবস্থানে যায়। পরে সেগুলি আবার RUN-এ ফিরিয়ে আনা হয়। অর্থাৎ পাইলটরা ইঞ্জিন পুনরায় চালু করার চেষ্টা করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু ততক্ষণে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটির অনেক কাছাকাছি চলে গিয়েছিল, ফলে পর্যাপ্ত উচ্চতা না থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানা গিয়েছে, ককপিটের ভয়েস রেকর্ডিংয়ে সুইচ সরানোর বিষয়ে একজন পাইলট অন্যজনকে প্রশ্ন করেছিলেন বলে শোনা যায়, এবং উত্তরে বোঝা যায় যে কেউই ইচ্ছাকৃতভাবে সুইচগুলো সরানোর কথা স্বীকার করেননি। অন্তর্বর্তী রিপোর্ট অনুযায়ী, বিমান রানওয়ে ছাড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এক জন আর এক জনকে ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কেন জ্বালানির সুইচ বন্ধ করে দিলে?’ অন্য জন উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি কিছু বন্ধ করিনি।’ কোনটি কার কণ্ঠ, রিপোর্টে তা স্পষ্ট করা হয়নি।
এই কথোপকথনকে ঘিরে পাইলটের ভুলের সম্ভাবনা নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে AAIB-এর প্রাথমিক রিপোর্ট কোনও পাইলটকে দায়ী করেনি এবং সুইচ কী ভাবে CUTOFF অবস্থায় চলে গেল, তারও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেয়নি।
জানা গিয়েছে, এখনও এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং তদন্তকারীরা প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল এবং মানবিক—সব দিক খতিয়ে দেখছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচের যান্ত্রিক পরীক্ষায় ত্রুটি না মেলার অর্থ দুর্ঘটনার কারণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে—এমন নয়। গোটা থ্রাস্ট কন্ট্রোল মডিউল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট উপাদানের পরীক্ষা এখনও বাকি রয়েছে। এরপর সমস্ত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছবে তদন্তকারী সংস্থা।
AAIB-এর তদন্তে বিমানটির টেকনিক্যাল স্ট্যাটাস, ইঞ্জিন, ফ্লাইট কন্ট্রোল, রক্ষণাবেক্ষণ, ককপিটের কার্যকলাপ এবং টেকঅফের সময়কার পরিস্থিতি—সবই পরীক্ষা করা হয়েছে।
প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিমানের জ্বালানিতে কোনও দূষণ ধরা পড়েনি। পাইলটদের প্রশিক্ষণ, মেডিক্যাল ফিটনেস এবং বিশ্রামের বিষয়টিও পরীক্ষা করা হয়েছিল। আবহাওয়া ও পাখির সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনাও প্রাথমিক ভাবে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসেনি।
তদন্ত শেষ পর্যায়ে পৌঁছলেও চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশের জন্য এখনও বেশ কিছু প্রক্রিয়া বাকি। AAIB সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, চূড়ান্ত রিপোর্ট অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে জমা দেওয়ার টার্গেট রয়েছে। তদন্তে শুধু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নয়, দুর্ঘটনায় বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যু হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলির বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা হয়েছে।
বিদেশে বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ফরেন্সিক ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করানোর কারণেও তদন্তে সময় লাগছে বলে আদালতকে জানানো হয়েছে।
AI-171 দুর্ঘটনা শুধু এয়ার ইন্ডিয়া বা ভারতের জন্য নয়, Boeing 787 Dreamliner-এর নিরাপত্তা নিয়েও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে দুই ইঞ্জিনের ফুয়েল সুইচ একই সময়ে CUTOFF অবস্থায় চলে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।
তাই তদন্তকারীদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন—সুইচ দু’টি কীভাবে CUTOFF অবস্থায় গেল এবং কেন গেল? যান্ত্রিক ত্রুটি না পাওয়ার পরে এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ককপিটের কার্যকলাপ, সুইচের অপারেশন, সংশ্লিষ্ট সিস্টেম এবং মানবিক কারণ—সবকিছুর বিশ্লেষণই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
AAIB-এর বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনা তদন্তের উদ্দেশ্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়, ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যায়, তার জন্য কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সেফটি রেকমেন্ডেশন তৈরি করাই মূল লক্ষ্য।