সাপের কামড় নিয়ে আর চিন্তা নেই,পথ দেখাল 'ধন্যি মেয়ে'
আজকাল | ২৯ জুলাই ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: বর্ষা এলেই কৃষকদের ব্যস্ততা যেমন বাড়ে, তেমনই বাড়ে নানা ঝুঁকিও। বিশেষ করে ধানখেত বা জলমগ্ন কৃষিজমিতে নেমে কীটনাশক ও তরল সার স্প্রে করতে গিয়ে প্রতিবছরই বহু কৃষক সাপের কামড়ের শিকার হন। কখনও প্রাণহানি, কখনও গুরুতর অসুস্থতার মতো ঘটনাও ঘটে। এই ঝুঁকি কমিয়ে কৃষিকাজকে আরও নিরাপদ, দ্রুত এবং আধুনিক করে তুলছে কৃষি ড্রোন। আর সেই প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করেই দক্ষিণ বাঁকুড়ার কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন জেলার গৃহবধূ ময়না সিংহ মহাপাত্র।
কৃষক পরিবারের মেয়ে ময়না সিংহ মহাপাত্র উত্তরপ্রদেশে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষি ড্রোন পরিচালনার দক্ষতা অর্জন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে নিজের জেলায় ফিরে তিনি ড্রোনের মাধ্যমে কীটনাশক ও তরল সার স্প্রে করার পরিষেবা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর এই উদ্যোগ দক্ষিণ বাঁকুড়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ড্রোন প্রযুক্তির অন্যতম বড় সুবিধা হল এর গতি ও নির্ভুলতা। মাত্র দুই থেকে আড়াই মিনিটে এক বিঘা জমিতে কীটনাশক বা তরল সার স্প্রে করা সম্ভব হচ্ছে। যেখানে একই কাজ হাতে করতে একজন কৃষকের চার বিঘা জমিতে প্রায় সারাদিন সময় লেগে যায়, সেখানে ড্রোন কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাজ শেষ করে দিচ্ছে। ফলে সময়, শ্রম এবং উৎপাদন খরচ—সবই উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।
ড্রোনের বিশেষ ট্যাঙ্কে তরল কীটনাশক বা সার ভরে নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে সমানভাবে স্প্রে করা হয়। এর ফলে ফসলের প্রতিটি অংশে সমানভাবে ওষুধ পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে কম জল ব্যবহার হয় এবং ওষুধের অপচয়ও অনেক কমে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কৃষকদের আর জলভরা জমিতে নেমে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে না। বর্ষাকালে সাপের আতঙ্ক থেকে অনেকটাই মুক্তি মিলছে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে।
বর্তমানে প্রতি বিঘা মাত্র ১০০ টাকা পারিশ্রমিকে এই পরিষেবা দিচ্ছেন ময়না সিংহ মহাপাত্র। কম খরচে দ্রুত ও নিরাপদ পরিষেবা পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ড্রোনের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক কৃষকের মতে, এতে শুধু শারীরিক পরিশ্রমই কমছে না, অল্প সময়ে অনেক বেশি জমিতে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কৃষিকাজ আরও পরিকল্পিত, দক্ষ এবং লাভজনক হয়ে উঠছে।
এই মুহূর্তে তিনটি কৃষি ড্রোনের মাধ্যমে পরিষেবা দেওয়া হলেও চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক কৃষকের কাছে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির এমন ব্যবহার কৃষিক্ষেত্রে নতুন বিপ্লব আনতে পারে। এতে উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষিকাজ আরও নিরাপদ, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব হবে।
ময়না সিংহ মহাপাত্রের এই উদ্যোগ শুধু একজন নারীর সাফল্যের কাহিনি নয়, এটি আধুনিক কৃষির পরিবর্তনেরও প্রতীক। তাঁর প্রচেষ্টা প্রমাণ করে দিয়েছে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার কৃষকদের জীবন ও জীবিকাকে আরও সুরক্ষিত করতে পারে। কৃষি ড্রোন তাই এখন শুধু আধুনিক যন্ত্র নয়, বরং নিরাপদ, স্মার্ট এবং ভবিষ্যতমুখী কৃষিকাজের এক নতুন ভরসা হয়ে উঠছে।