প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং তাঁর সরকার তখন একাধিক অভিযোগে বিদ্ধ। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘সমকালীন সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধীদের থেকেও আমার প্রতি ইতিহাস অনেক বেশি সদয় হবে।’ মনমোহনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী যেন মিলে গেল। অবশেষে কয়লা ব্লক বরাদ্দ মামলায় ক্লিনচিট পেলেন তিনি। সিবিআইয়ের দাখিল করা ‘ক্লোজার রিপোর্ট’ গ্রহণ করে তাঁকে অভিযুক্ত হিসেবে তলব করার বিষয়ে ২০১৫-য় নিম্ন আদালতের দেওয়া নির্দেশটি বাতিল করে দিল সুপ্রিম কোর্ট।
সেটা ২০১২-য় দ্বিতীয় ইউপিএ জমানার শেষ দিক। প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে মনমোহন সিং। ওডিশার তালাবিরা-২ কোল ব্লক বরাদ্দকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আসে তথাকথিত ‘কোল স্ক্যাম’। অভিযোগ ওঠে, নিয়ম না মেনে বেসরকারি সংস্থাকে কয়লাখনি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বিতর্কের জেরে একাধিক কোল ব্লকের বরাদ্দ বাতিল করা হয়। বিরোধীরা তৎকালীন ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তোলে।
বিশেষ আদালতের সেই নির্দেশের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দেয়। এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলার পর বুধবার চূড়ান্ত রায়ে সেই সমনই বাতিল করে দিল শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বুধবার জানিয়েছে, বিশেষ আদালত সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট খারিজ করার মতো যথেষ্ট আইনি কারণ দেখাতে পারেনি। তাই ২০১৫ সালের ১১ মার্চের সেই নির্দেশ বাতিল করে ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়েছে এবং মামলাটি মেরিটের ভিত্তিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও, মনমোহন সিংয়ের ব্যক্তিগত সততা নিয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় সমালোচকও কখনও প্রশ্ন তোলেননি। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় তাঁর মৃত্যুর পর সেই বিতর্কের আইনি অধ্যায়ে দাঁড়ি টানল। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্টের সঙ্গে নিম্ন আদালত ভিন্নমত পোষণ করতেই পারে, তবে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য আইনি ভিত্তি থাকা জরুরি। এই মামলায় সেই ভিত্তি না থাকায় সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্টই বহাল রাখা হয়েছে।
ওডিশার তালাবিরা-২ কয়লা ব্লক বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই মামলা হয়। ইউপিএ সরকারের সময় এই বরাদ্দ নিয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
বরাদ্দের সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পাশাপাশি কয়লা মন্ত্রকের অতিরিক্ত দায়িত্বও তাঁর কাছেই ছিল। সেই কারণেই তদন্তের আওতায় তাঁর নাম আসে।
সিবিআই তদন্ত শেষে জানায়, মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। সেই কারণেই ক্লোজার রিপোর্ট দাখিল করা হয়।
বিশেষ সিবিআই আদালত সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ না করে মনমোহন সিং এবং আরও পাঁচজনকে অভিযুক্ত হিসেবে তলব করেছিল।
শীর্ষ আদালতের মতে, ক্লোজার রিপোর্ট খারিজ করার জন্য বিশেষ আদালত কোনও গ্রহণযোগ্য আইনি যুক্তি দেখাতে পারেনি। তাই সমন বাতিল করে ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, নিম্ন আদালত তদন্তকারী সংস্থার মতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারে, তবে তার পক্ষে যথাযথ ও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি থাকতে হবে।
কয়লা কেলেঙ্কারি ইউপিএ সরকারের অন্যতম বড় বিতর্ক ছিল। সেই বিতর্কের সঙ্গে জড়িত মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে থাকা এই মামলারও অবশেষে আইনি পরিসমাপ্তি ঘটল।
মৃত্যুর প্রায় দু’বছর পরে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি মামলার ইতি টানল এবং তালাবিরা-২ মামলায় তাঁকে সম্পূর্ণ আইনি স্বস্তি দিল।