পিনাকী চক্রবর্তী
পেটের কাছে একটা রামধনু উঠেছে। বুকের কাছে গাছ। আর গলাটা জিরাফের মতো লম্বা। কাগজ আর বাঁশ দিয়ে এমনই বাঘ বানিয়েছে আলিপুরদুয়ারের কুড়ি জন খুদে শিল্পী। এক ঝলকে জিরাফ বলে ভুল হতে পারে। কিন্তু তাতে কী? অঞ্জন দত্ত রং-পেনসিল হারানোর আক্ষেপে গেয়েছিলেন, ‘ছিল নীল রঙের কোকিল, লাল রঙের কাক/ গেল কোথায়, গেল কোথায় পেনসিল/ রঙ পেনসিল...।’ ওই খুদেদের হাতে রং আছে, পেনসিলও আছে। আর আছে এক আকাশ কল্পনা। ওরা তো এমন বাঘ বানাবেই।
ওদের কেউ স্কুলে যায়। কেউ আবার মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। কারও সকাল কাটে খেলার মাঠে, কারও দিন গড়ায় চা-বাগানের শ্রমিক লাইনে। এক ঝাঁক পায়রা যেন। তারাই কচি হাতে তিন দিনে গড়ে তুলেছে এই বিশাল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। তারা অবশ্য আসল বাঘ কোনও দিন চোখে দেখেনি। শুধু কল্পনা, শোনা গল্প আর রঙে জীবন্ত হয়ে উঠেছে দক্ষিণা রায়। ঘাঁটি গেড়েছে আলিপুরদুয়ারের কালচিনি ব্লকের আটিয়াবাড়ি চা বাগানে।
এই ভাবনার নেপথ্যে আলিপুরদুয়ারের যুব শিল্পী সিদ্ধান্ত পাটোয়া। তিনি এই মাটির ছেলে। খুব ভালো কারে জানেন, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের পাশই বড় হয়ে ওঠা অনেক শিশুর কাছেই বাঘ শুধুই বইয়ের ছবি। কিংবা বড়জোর গল্পের চরিত্র। আগামী ২ অক্টোবর বক্সার জঙ্গলে আসছে নতুন অতিথি, একটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। তার আগমনের আগে শিশুমনে তার পদধ্বনি এঁকে দিতেই এই উদ্যোগ নেন সিদ্ধান্ত।
তিন দিন ধরে কাগজ, বাঁশ, রং আর অক্লান্ত পরিশ্রমে ধীরে ধীরে জন্ম নিল বাঘ। নিখুঁত ভাস্কর্যের দাবি হয়তো কেউ করবে না। সিদ্ধান্তও করছেন না। তাঁর দাবি, এ নিছকই সৃজনশীলতাকে উস্কে দেওয়ার প্রয়াস। সিদ্ধান্ত বললেন, ‘২ অক্টোবর বক্সার জঙ্গলে পা রাখবে রয়্যাল বেঙ্গল। তার আগে ওদের সামনে বাঘের একটি বাস্তব অবয়ব তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। কল্পনাশক্তি আর সৃজনশীলতাকে উস্কে দিতেই এই কর্মশালার আয়োজন।’
‘কাগুজে বাঘ’ তৈরি শেষ হতেই উৎসব শুরু হয়ে যায়। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে কাঁধে করে চা-বাগানের শ্রমিক লাইনে ঘুরতে শুরু করে খুদেরা। তারা শুধু নিজেদের কাজ দেখায় না, বোঝায় বাঘ কেন প্রয়োজন, কেন জঙ্গল বাঁচাতে হবে, কেন বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ শুধু বন দপ্তরের নয়, সকলের দায়িত্ব। খুদেদের প্রশংসা করেছেন উত্তরবঙ্গের বন আধিকারিকরাও। তাঁদের এক জনের কথায়, ‘গুঞ্জন ওঁরাও, প্রশান্ত গোয়ালা, বিকাল খড়িয়াদের মতো একদল শিশুকে নিয়ে মাত্র তিন দিনে সিদ্ধান্ত যে কাজটা করেছে, তা নিছক শিল্পকর্ম নয়, সংরক্ষণের এক অসাধারণ বার্তা।’
সিদ্ধান্ত নিজের এটাকে শুধু শিল্পচর্চা হিসেবে দেখতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, ‘এই বাঘ একটা বাঁশ-কাগজের ভাস্কর্য নয়। প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্কের প্রতীক।’ বাঘের ফিরে আসা মানে মানুষের সঙ্গে তার সহাবস্থানের দায় মনে করিয়ে দেওয়া বলেই মনে করেন তিনি।
আটিয়াবাড়ি চা বাগানের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কথা পৌঁছে গিয়েছে রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওঁরাওয়ের কাছেও। তিনি খুব খুশি, ‘সত্যিই অসাধারণ উদ্যোগ। এমন ভাবনা যদি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তা হলে বনদপ্তরের সংরক্ষণ কর্মসূচি অনেক বেশি সফল হবে।’
যে শিশুরা কোনও দিন বাঘ দেখেনি, তারাই আজ বাঘকে ভালোবাসার ভাষা শিখছে। কাগজ, রং আর কল্পনায় গড়া সেই বাঘ শিখিয়ে দিল—জঙ্গল মানুষেরও। আর বাঘ বাঁচলে তবেই বাঁচবে সেই জঙ্গল, রক্ষা পাবে প্রকৃতির ভারসাম্য।