• আগে বেচতেন সবজি, এখন বেচেন 'জিন'! মুর্শিদাবাদে যা হল
    আজকাল | ৩০ জুলাই ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি সহ গোটা জেলার ভরসা হয়ে উঠেছিল এই 'ডাক্তারের' চেম্বার। ডাক্তারের দাবি ছিল, 'জিন' ডেকে রোগ তাড়ান। আর এই দাবিতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত তাঁর কাছে। জ্বর, পেটে ব্যথা, বাচ্চার কান্না, মানসিক অবসাদ। এমনকি 'জিনে' ধরলে তা থেকে মুক্তির জন্যেও দলে দলে মানুষ ভিড় জমাত চেম্বারে। পাশাপাশি  ইউটিউবে ডাক্তারের ভিডিও ভাইরাল। ফলোয়ার ৪৭ হাজারেরও বেশি । কিন্তু এই সবকিছুর পেছনেই চলত মানুষকে প্রতারণা করার বিশাল ব্যবসা। বুধবার সেই চেম্বারে হানা দিয়ে ভুয়ো ডাক্তারের পর্দা ফাঁস করল সাগরদিঘি থানার পুলিশ।  

    মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি থানা এলাকার পোপাড়া গ্রামে বছরের পর বছর ধরে ‘জিনের মাধ্যমে’ রোগ সারানোর নামে মানুষের কাছ থেকে মোটা টাকা আদায় করার অভিযোগে এক ভুয়ো 'জিন-মালিক' চিকিৎসককে আটক করল পুলিশ। ধৃতের নাম রাজফুল শেখ।

    বুধবার সকালে সাগরদিঘি থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক অরিজিৎ সরকারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল এবং সাগরদিঘি ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ওয়াসিম আক্রাম পোপাড়া গ্রামে রাজফুলের চেম্বারে হানা দেয়। চিকিৎসার কোনও বৈধ নথি দেখাতে না পারায় তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং চেম্বারটি সিল করে দেয় পুলিশ।

    স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক বছর আগেও রাজফুল সাগরদিঘি স্টেশনের ধারে সবজি বিক্রি করতেন। এরপর নিজের বাড়িতেই তিনি একটি চেম্বার খুলে বসেন। প্রথমে জিন-জাদু’র মাধ্যমে চিকিৎসা করলেও পরবর্তী সময় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার বোর্ড টাঙিয়ে চলে কারবার।  তাঁর দাবি ছিল, ইসলামিক রীতি মেনে তিনি স্বর্গ থেকে জিনদের ধরে আনেন এর পর সেই জিনদের সাহায্যে বিভিন্ন জটিল রোগ সরিয়ে দেন।  এমনকী ‘জিনে ধরা’ রোগীকেও তিনি জিনদের সাহায্য নিয়ে নাকি নিমেষে সরিয়ে তুলতেন। 

    শুধু চেম্বারেই সীমাবদ্ধ ছিল না তাঁর ব্যবসা। প্রচারের জন্য তিনি একটি ইউটিউব চ্যানেলও খুলেছিলেন। সেখানে তিনি দেখাতেন কীভাবে জিন ডেকে রোগীকে সুস্থ করা হয়, কীভাবে জিন তাড়ানো হয়। অবৈজ্ঞানিক এই ভিডিওগুলিই তাঁর জনপ্রিয়তার মূল কারণ হয়ে ওঠে। ৪৭ হাজারেরও বেশি ফলোয়ার জুটে যায় তাঁর চ্যানেলে। ফলস্বরূপ মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, এমনকি জেলার বাইরে থেকেও রোগীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন তাঁর চেম্বারে।

    অভিযোগ, এই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিকিৎসার জন্য রাজফুল প্রত্যেক রোগীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন। সাধারণ মানুষ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে দিনের পর দিন তাঁর কাছে ছুটে যেতেন। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসে সাগরদিঘি থানা এবং জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর।

    বুধবার অভিযানের সময় রাজফুলের কাছে চিকিৎসার বৈধ কাগজপত্র চাওয়া হলে তিনি প্রথমে তর্ক শুরু করেন। নিজের ভুল স্বীকার না করে উল্টে পুলিশ ও স্বাস্থ্য আধিকারিকদের ‘ইসলামিক পদ্ধতিতে জিন জাদুর চিকিৎসা’র যুক্তি বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর কোনও কথাতেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি আধিকারিকরা।

    জেরার মুখে রাজফুল বলেন, "প্রথমের দিকে আমি ইসলামিক পদ্ধতিতে জিন জাদুর মাধ্যমে চিকিৎসা করতাম।  তারপর বুঝলাম চিকিৎসা করার জন্য আমার মানুষের শরীরের সম্পর্কে জানা দরকার। তখন আমি অনলাইনে একটি দু'বছরের হোমিওপ্যাথির কোর্স করি। তারপর রোগীদের চিকিৎসা করার জন্য আমি চেম্বার খুলেছি ।"

    সাগরদিঘি ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ওয়াসিম আক্রামের জানান, 'ধৃতের কাছে হোমিওপ্যাথি বা অন্য কোনও চিকিৎসা করার বৈধ ডিগ্রি বা রেজিস্ট্রেশন ছিল না। জিনের নামে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে চিকিৎসা করা এবং অর্থ আদায় করা সম্পূর্ণ বেআইনি। প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।'

     
  • Link to this news (আজকাল)