• বাংলায় বাড়ছে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে লেখা বইয়ের বিক্রি
    আজকাল | ৩০ জুলাই ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘদিন ধরে কলেজ স্ট্রিটের বিভিন্ন বইয়ের দোকানের তাকে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে নিয়ে লেখা বইগুলোয় ধুলো জমছিল। কিন্তু এখন, বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গের নবপ্রজন্ম অতীতের প্রেক্ষাপট জানার চেষ্টায় মগ্ম। 

    কলেজ স্ট্রিটের বই বিক্রেতারা জানিয়েছেন যে, শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর সাত দশকেরও বেশি সময় পরেও তাঁকে নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। এই প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ এবং 'ভারতীয় জনসংঘ'-এর প্রতিষ্ঠাতার জীবন ও আদর্শ নিয়ে লেখা বইয়ে খোঁজ করছেন পাঠকরা।

    কলেজ স্ট্রিটের 'অ্যালাইড বুকস ডিস্ট্রিবিউটরস'-এর মৈনাক সাহা বলেন, "এক দশক আগেও এইসব বই খুব একটা বিক্রি হত না। এখন মানুষ নির্দিষ্টভাবে এই বইগুলোর খোঁজ করে আসছেন।" মৈনাক সাহার মতে, বাংলায় নতুন সরকারের শপথগ্রহণের পর থেকেই অনেক পাঠক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে জানার ব্যাপারে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তিনি বলেন, "আগে এই বইগুলো প্রায় বিক্রিই হত না। হয়তো বছরে বা দেড় বছরে একটা কপি বিক্রি হত। এখন মানুষ তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইছেন এবং বিক্রিও বেড়েছে। আমরা এখন দিনে অন্তত ১৫টি করে বই বিক্রি করছি।"  

    একই সুর শোনা গেল 'দে’জ পাবলিশিং'-এর বই বিক্রেতা সুভাষ চন্দ্র দে-র মুখেও। তিনি জানান, তাঁর দোকানেও  শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে লেখা বইয়ের চাহিদা বেড়েছে। তিনি এখন আরও বেশি বইয়ের অর্ডার দিচ্ছেন। সুভাষ বাবু বলেন, "নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে নিয়ে লেখা বইয়ের বিক্রি বেড়েছে।" তিনি স্কুলগুলোর পক্ষ থেকেও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা উল্লেখ করেন। এখন স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হিসেবে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে লেখা বই দেওয়া হচ্ছে। শুধুমাত্র বই বিক্রেতারাই নন, ক্রেতারাও মুখার্জিকে নিয়ে লেখা বইয়ের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ লক্ষ্য করছেন এবং এই আগ্রহের বাড়বাড়ন্তকে ‘সময়ের দাবি’ বলে দাবি করেছেন।

    বাংলার সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাঙ্গনে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবদানের কথা তুলে ধরে রামসদয় কলেজের অমিতাভ ব্যানার্জি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। অমিতাভ-র কথায়, “শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অন্যতম বড় অবদান ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত সমাবর্তন বক্তৃতাটি বাংলায় দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। যা ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।” তিনি আরও বলেন যে, মুখার্জির প্রকৃত অবদান বা উত্তরাধিকারকে বুঝতে হলে পাঠকদের এমন সব বই আবার পড়তে হবে যা প্রায় পাঁচ দশক ধরে প্রচলনের বাইরে ছিল। অমিতাভ যোগ করেন, “আজকের দিনে শ্যামাপ্রসাদ খুব একটা পরিচিত নন, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে তিনি বাংলার এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, যাঁর অবদান সমাজের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।” 

    বই ও ইতিহাসের প্রতি গভীর আগ্রহসম্পন্ন ব্যবসায়ী অমিত গোস্বামী বলেন, “শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি না থাকলে হয়তো পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে টিকে থাকত না।” গোস্বামী মতে, বাংলার ইতিহাসে মুখার্জির গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও অনেকেই তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানেন না। তিনি বলেছেন, “আমাদের তো “শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সম্পর্কে খুব একটা কিছু শেখানো হয়নি, তাহলে আমরা জানবই বা কীভাবে? এখন তাঁর সম্পর্কে জানার সময় এসেছে, মানুষ জানুক।”

    কলেজ স্ট্রিটের আরেক বই বিক্রেতা প্রদীপ দত্ত 'ভারতীয় জনসংঘ'-এ প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির পুরনো এবং বর্তমানে অপ্রকাশিত বা দুষ্প্রাপ্য বইগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন। এমনই একটি বই হল ‘শ্যামাপ্রসাদের নির্বাচিত রচনা’, যা একসময় ‘বেঙ্গল পাবলিশার্স’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বলেন, “শুরুতে আমরা এই বইটির কথা জানতাম না। একজন পাঠক খোঁজ করার পরই আমরা জানতে পারি যে এটি ‘বেঙ্গল পাবলিশার্স’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। কোনও প্রকাশক যদি তা ফের ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে আমরা অবশ্যই তা আমাদের সংগ্রহে রাখতে চাইব।”

    মুর্শিদাবাদের নগর কলেজের অধ্যাপক জয়দীপ চক্রবর্তী ২৫ বছর ধরে পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান বিষয়ে অধ্যাপনা করছেন। তিনি জানান, ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি মুখার্জি সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন। তাঁর মতে, মুখার্জি এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কর্মময় জীবনের অনেক দিকই এখনও সেভাবে অন্বেষণ করা হয়নি। জয়দীপের কথায়, “নতুন সরকার বলেছে যে আমাদের শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা উচিত। কিন্তু সমস্যা হল, তাঁর সম্পর্কে আমার যথেষ্ট জানা নেই।”

    কলেজের সাংস্কৃতিক কমিটির সম্পাদক হিসেবে জয়দীপ চক্রবর্তী মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক কোনও অনুষ্ঠানে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সম্পর্কে কথা বলার আগে তাঁকে আরও ভালোভাবে জানা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, “তাঁকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য এবং তাঁর জীবনের যেসব দিক সম্পর্কে আমি জানি না, সেগুলো জানার জন্যই আমি এই বইটি কিনেছি।”

    ‘মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স’-এর বিক্রেতা দেব কুমার ভট্টাচার্যের মতে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ওপর লেখা দু'টি বই- তথাগত রায়ের ‘ভারত কেশরী যুগপুরুষ শ্যামাপ্রসাদ’ এবং উমা প্রসাদ মুখার্জির ‘শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি ও মৃত্যু প্রসঙ্গ’ সারা বছর ধরেই নিয়মিত বিক্রি হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর থেকে এই দু'টি বইয়েরই চাহিদা বেড়েছে।

    রাজ্য বাজেটে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছে যে, ৬ জুলাই অর্থাৎ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জন্মবার্ষিকীতে এবার থেকে প্রতিবছর রাজ্য সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালন করা হবে।

    তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
  • Link to this news (আজকাল)