হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে খুশি। ক্লাসরুমের সামনে সেই বারান্দা। সেখােনে থেবড়ে বসে খুদের দল। সামনে কানা উঁচু স্টিলের থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। তার গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঝোল। আর ক্লাস ওয়ানের খুশি করের হাতে আস্ত ডিম। একটা নয়, দু’টো। খুশির আনন্দ দেখে কে!
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের জয়েন খাঁ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বুধবার যেন মেলা বসেছিল। নেপথ্যে ‘ভাইরাল খুশি’। এখন তাকে এই নামে ডাকছে বন্ধুরা। বুধবার মিড ডে মিলে ছিল ‘ডিম খাওয়ার দিন’। স্যর সাদ্দাম হোসেন তার হাতে প্রথমে একটা ডিম তুলে দেন। একগাল হাসি নিয়ে হাত পেতে নেয় খুশি। ফোকলা মুখে ফিক করে হেসেও দেয়।
মনে কি কোনও ‘ষড়যন্ত্র’ চলছিল? সেই সুযোগ অবশ্য সাদ্দাম দেননি। আর একটা ডিম খুশির হাতে তুলে দেন তিনি, ‘এটা তোমার ভাইয়ের জন্য।’ ছোট ছোট বিনুনি করা চুল নেড়ে দু’হাতে দু’টো ডিম নিয়ে অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে খুশি। তার পরে একটা পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। স্যর অবশ্য বলে দেন, ‘একটা তুমি খাবে কিন্তু।’ খুশি কিছু বলে না, শুধু ঘাড় নাড়ে। মুখের হাসিতে আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর কিছুটা বোধহয় বেদনাও।
এ দিন খুশির হাতে উপহারও তুলে দেন মাস্টারমশাইরা। চাঁদা তুলে কিনে দেন ব্যাগ, রং পেনসিল, আঁকার খাতা, আর ক্যাডবেরি সেলিব্রেশনের একটা বড় প্যাকেট। ভাইয়ের সঙ্গে মিলে খুশি খাবে। সঙ্গে মেমেন্টো। খুশির বাবা আর দিদিমাও এসেছিলেন স্কুলে। তাঁদেরও মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
খুশির বাবা টোটো চালক শম্ভু করের চোখের কোণে জল। অবশ্য বুঝতে দিলেন না। ডানহাতের চেটো দিয়ে মুছে নিয়ে বললেন, ‘আমার মেয়েটা বরাবর ওই রকম। বয়স কম, কিন্তু অনেক পরিণত।’ তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছেন সাদ্দাম। তিনিই প্রথম ভিডিয়োটা করেছিলেন। ভাইয়ের জন্য খুশির ডিম নিয়ে যাওয়ার ভিডিয়ো। মাস্টারমশাইয়ের প্রশ্নের জবাবে অম্লান বদনে সে বলেছিল, ‘আমি তো রোজ খাই, একদিন ভাই খাক।’
খুশি তখন হাসি মুখে দু’হাতে দু’টো ডিম নিয়ে স্কুলের বারান্দায় বসে। ফোকলা মুখে সেই হাসি। তবে কিছু বলছে না। যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, পেট ভরে খাওয়াটা অনেক কিছু ঠিকই, কিন্তু ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছেটুকু পৃথিবীর সবেচেয়ে বড় সম্পদ। আর সেই ইচ্ছের নাম — খুশি।