• বাড়িতে ২৮.৫ কোটি নগদ, ১৫ কেজি গোল্ড বার! পাথরের ব্যবসায় আচমকা বদলে যায় মিনারের জীবনযাত্রা
    এই সময় | ৩০ জুলাই ২০২৬
  • হেমাভ সেনগুপ্ত, সিউড়ি

    টাকা! আরও টাকা! আরও আরও টাকা! এতই যে, হাতে গোনা যাচ্ছে না। মেশিন এনে গুণতে হচ্ছে।

    ২০ কোটি টাকা! তার জন্য ৫০০ টাকার নোটের চার হাজার বান্ডিল প্রয়োজন! বুধবার রাত পর্যন্ত বীরভূমের মহম্মদবাজারের মহম্মদ মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে মিলেছে সাড়ে ২৮ কোটি টাকা! মানে ৫৭০০ বান্ডিল।

    পুলিশ জানিয়েছে, দোতলা ও একতলার দু’টি ঘরে একাধিক লোহার আলমারি ছিল। সেখানে ক্যাম্বিস ও রেক্সিন — দু’ধরনের ব্যাগের ভিতরে টাকার বান্ডিল রাখা ছিল। আলমারিগুলিতে শুধু টাকাই ছিল। না ছিল জামাকাপড়, না ছিল অন্য কোনও কাগজ। বাড়িতে বক্স খাটের ভিতরেও ছিল টাকা ও সোনা।

    এই মিনার আট বছর আগেও সরকারি বাস চালাতেন। তাঁর বাড়ি থেকে সাড়ে ২৮ কোটি টাকা ছাড়াও ১৫ কেজি সোনার বারও মিলেছে। বুধবারের সোনার বাজারদর অনুযায়ী, তার দাম প্রায় ২২ কোটি টাকা!

    স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, এত টাকা কোথা থেকে পেলেন মিনার? স্থানীয় সূত্রের খবর, সরকারি বাসচালকের চাকরি ছেড়ে পাথর ব্যবসায় নেমেছিলেন মিনার। তারপরেই বদলাতে থাকে তাঁর জীবনযাত্রা।

    বীরভূমের বালি মাফিয়া টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নাজ়িবুদ্দিনের আত্মীয় এই মিনার। এসপি ভিআর ভুন্দেশ বুধবার রাতে বলেন, ‘এই ঘটনায় টুলু, মিনার ও আরও কয়েক জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। আমরা জেনেছি, এই বেআইনি টাকা ও সোনা টুলু মণ্ডল পরিচালিত সিন্ডিকেটেরই। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হবে।’

    উদ্ধার হওয়া টাকা ও সোনার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বুধবার সকালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী লেখেন, ‘সূত্র মারফত খবর পেয়ে বীরভূম পুলিশ বালি মাফিয়া টুলু মণ্ডলের গোপন ডেরায় অভিযান চালিয়ে ১৫ কেজি সোনা ও সাড়ে পাঁচ কোটি (রাতে সেই পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ২৮.৫ কোটি) টাকা উদ্ধার করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে

    জি়রো টলারেন্সই মূল নীতি। দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ পুলিশের এই অভিযানের প্রশংসাও করেছেন শুভেন্দু।

    স্থানীয়দেরও অভিযোগ, মিনারের বাড়িতে লুকোনো ছিল টুলুর টাকা ও সোনা। ‎টুলু বীরভূমে পরিচিত নাম। এক সময়ে অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনি পাথর খাদান চালানোর অভিযোগ উঠেছিল। গোরু পাচার মামলাতেও নাম জড়িয়েছিল টুলুর। ২০২২–এ তাঁর বাড়ি এবং অফিসে হানা দিয়েছিল ইডি। ২০২৪–এ চর্চায় এসেছিল তাঁর মেয়ের বিয়েও। অভিযোগ, ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল সেই বিয়েতে! যাকে বলা যায়, ‘বিগ ফ্যাট ওয়েডিং’। অতিথি হিসেবে সেখানে হাজির ছিলেন বলিউডের অভিনেতা আরবাজ় খান, জ়ারিন খান, আফতাব শিবদাসানি, আসরানি, টলিউডের অঙ্কুশ হাজরা, দর্শনা বণিকরা। পুরোনো সেই বিয়ের ভিডিয়ো এ দিন আবার ছড়িয়ে পড়ে নেটদুনিয়ায়। একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন টুলু।

    স্থানীয় সূত্রের দাবি, ‎‎২০১৪-১৫-র পরে অনুব্রতর ঘনিষ্ঠ বলয়ে পৌঁছন টুলু। কয়েক বছরের মধ্যে জেলার পাথর খাদানে ডিসিআর (ডেইলি কালেকশন রেজিস্টার)–এর কাজ (অর্থাৎ খাদান থেকে পাথর বেরোনোর জন্য সরকারি ট্যাক্স সংগ্রহ) শুরু করেন টুলু। সরকারের তরফে টুলুর কোম্পানিকেই ট্যাক্স সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে কোটি কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। সেই টুলুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মিনার। মিনারকেও এই পাথর ব্যবসায় নামান টুলু। প্রথমে পাথর খাদান, পরে ক্রাশার কিনে ব্যবসা শুরু করেন মিনার। রাতারাতি কিনে ফেলেন বেশ কিছু ডাম্পারও। অভিযোগ, এর সঙ্গে চলতে থাকে বালি কারবারের বেআইনি ব্যবসা।

    মঙ্গলবার গভীর রাত প্রায় তিনটে নাগাদ মহম্মদবাজারের ডেউচায় মিনারের বাড়িতে পৌঁছয় পুলিশ। প্রায় ৬০ বছর বয়সী মিনারকে পুলিশের একটি দল তুলে মহম্মদবাজার থানায় নিয়ে যায়। অন্য একটি দল বাড়িতে তল্লাশি শুরু করে। থানায় মিনারকে জিজ্ঞাসাবাদে আলমারি ও অন্য জায়গায় টাকা রাখার কথা জানা যায়। এত বিশাল পরিমাণ টাকা গুণতে বুধবার সকালে নোট গোনার পাঁচটি যন্ত্র ও পাঁচটি বড় ট্রাঙ্ক আনা হয়। মিনারের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া টাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় বুধবার রাতে সিউড়িতে বীরভূমের পুলিশ সুপারের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপরেও রাতভর তল্লাশি চলে এবং তখন লোডশেডিংয়ের আশঙ্কায় বিকেলে মিনারের বাড়িতে জেনারেটরও নিয়ে যাওয়া হয়। তার আগে মিনারের ছেলেকে থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। মিনার ও তাঁর ছেলে বুধবার রাত পর্যন্ত মহম্মদবাজার থানাতেই ছিলেন।

    তদন্তকারীদের দাবি, মিনারের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার সঙ্গে টুলুর অবশ্যই যোগ রয়েছে। মিনারের কাছে যে কোটি কোটি টাকা গচ্ছিত রয়েছে, তা তাঁর মোবাইলের কথোপকথনে আড়ি পেতে পুলিশ নিশ্চিত হয়। গ্রাম থেকে বেশ খানিকটা দূরে দোতলা সাদামাটা বাড়ি। প্রতিবেশী বা গ্রামবাসীদের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা ছিল না। সাঁইথিয়ার বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণকান্ত সাহা বলছেন, ‘রাজ্যে পরিবর্তনের পরে চোর, ডাকাত, সিন্ডিকেটরাজ বন্ধ হচ্ছে। যাঁরা বলেছিলেন খেলা হবে, তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন, কী খেলা হচ্ছে।’ অনুব্রতকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইলে পাঠানো বার্তারও জবাব মেলেনি।

    নেপথ্যে যে টুলু — তিনি নাকি আপাতত দুবাইয়ের কোনও এক রিসর্টে সময় কাটাচ্ছেন!

  • Link to this news (এই সময়)