আজকাল ওয়েবডেস্ক: বীরভূমের মহম্মদবাজারে পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের আত্মীয়ের বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। মিনার মণ্ডলের ওই বাড়ি থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার করেছে পুলিশ। নগদ ও সোনা মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া সম্পদের মূল্য ৫০ কোটি টাকারও বেশি বলে জানা গিয়েছে। বুধবার দিনভর এবং গভীর রাত পর্যন্ত চলে টাকা গোনার কাজ।
ঘটনায় মিনার মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাতভর তল্লাশির পর বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার হওয়া টাকা এবং সোনার বাট নিরাপত্তার ঘেরাটোপে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাস্থল ঘিরে রাখে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। বাড়িটি সিল করা হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তল্লাশিতে যা কিছু উদ্ধার হয়েছে, তা ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রেখে বাড়িটিও সিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া ১৫ কেজি সোনার মধ্যে সোনার বাট ও বিস্কুট রয়েছে। উদ্ধার হওয়া সোনার বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি বাড়ির একাধিক জায়গা থেকে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ নগদ। বিশেষভাবে তৈরি করা দুটি আলমারিতে চটের বস্তায় টাকা রাখা ছিল বলেও পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তবে এত বিপুল টাকা ও সোনা কীভাবে ওই বাড়িতে এল, তার উৎস কী, এবং এর সঙ্গে কারা যুক্ত—সেই প্রশ্নই এখন তদন্তের কেন্দ্রে। ধৃত মিনার মণ্ডলের স্ত্রী ও ছেলে সংবাদমাধ্যমের সামনে দাবি করেছেন, বাড়িতে এত বিপুল পরিমাণ টাকা ও সোনা মজুত থাকার বিষয়ে তাঁরা আগে কিছুই জানতেন না। আচমকাই পুলিশ তল্লাশি শুরু করার পর বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।
গোটা ঘটনার সূত্রপাত আরও চাঞ্চল্যকর। পুলিশ সূত্রে খবর, কয়েকজন সন্দেহভাজন ডাকাতকে অস্ত্র-সহ আটক করার পর তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জেরায় অভিযুক্তদের একজন দাবি করে, মহম্মদবাজার এলাকার মিনার মণ্ডলের বাড়িতে বিপুল নগদ টাকা রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ ওই ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে মিনারের বাড়িতে পৌঁছয়। এরপর শুরু হয় তল্লাশি। প্রথমে উদ্ধার হয় নগদ টাকা। পরে বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে মেলে সোনা। সেখান থেকেই তদন্তের মোড় ঘুরে যায়।
উদ্ধার হওয়া বিপুল সম্পদের সঙ্গে পাথর ও বালি ব্যবসার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মিনার মণ্ডলকে পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নাজিবুদ্দিনকে বীরভূমের পাথর ও বালি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে দেখা হয়েছে। মিনারের বাড়ি থেকে ২৮.৫ কোটি টাকা এবং ১৫ কেজি সোনা উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
এই বিপুল উদ্ধারের পর বীরভূমের কথিত পাথর-বালি সিন্ডিকেট এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগও ফের সামনে এসেছে। বিজেপির তরফে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করা হয়ে আসছে, বীরভূমের পাথর ও বালি ব্যবসাকে ঘিরে বেআইনি আর্থিক লেনদেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ঘটনা রয়েছে। বিপুল টাকা ও সোনা উদ্ধারের ঘটনা সেই অভিযোগকে নতুন করে রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।
অন্যদিকে, তৃণমূলের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি এই ঘটনাকে ঘিরে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু টুলু মণ্ডল বা মিনার মণ্ডলকে সামনে রেখে তদন্ত শেষ করলে হবে না। বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রকৃত মালিক কে, কোথা থেকে এই টাকা এল, সোনা কেন বা কী উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল এবং এর পিছনে আরও প্রভাবশালী কেউ রয়েছেন কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। রাজনৈতিক যোগ থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
গোটা ঘটনায় এখন তদন্তকারীদের নজর উদ্ধার হওয়া টাকা ও সোনার উৎসের দিকে। অর্থের হিসাব, সম্পত্তির নথি, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হতে পারে। একইসঙ্গে পাথর ও বালি ব্যবসার সঙ্গে এই বিপুল সম্পদের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
একটি বাড়ি থেকে সাড়ে ২৮ কোটি টাকা এবং ১৫ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় ইতিমধ্যেই বীরভূমের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। টাকার পাহাড় ও সোনার বাটের এই উৎস কোথায়, কার অর্থ এবং এর পিছনে আরও কোনও বড় চক্র রয়েছে কি না—এখন সেই রহস্যেরই উত্তর খুঁজছে পুলিশ।