কোথাকার জল কোথায় গড়ায়৷ সবটাই যেন দুর্নীতির বিশাল একটা নেটওয়ার্কের ছোট ছোট অংশ৷ এই যেমন বীরভূমে পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল ঘনিষ্ঠ মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা এবং সোনা উদ্ধারের পরেই একে একে সামনে আসছে বিভিন্ন সব কানেকশন৷ এবারের কানেকশনটা যেমন বীরভূমের সঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনার৷ যোগসূত্র দুর্নীতি, বেআইনি ব্যবসা এবং ‘তৃণমূল ঘনিষ্ঠতা’৷ কেন্দ্রে দু’টো নাম টুলু মণ্ডল এবং বারিক বিশ্বাস৷
দুর্নীতি অভিযোগের তালিকায় থাকা একসময়ের পরিচিত নাম৷ উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের সংগ্রামপুরে বাড়ি। গরিব ঘরের ছেলে, প্রথম জীবনে কর্মসূত্রে ট্রাকের সহকারি চালক হিসেবে কাজ করেন৷ তারপর ট্রাকের চালক। এলাকায় কান পাতলে শোনা যায়, যে সময় তিনি ট্রাক চালাতেন, সেই সময় বসিরহাট স্বরূপনগর সহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার হত। সেই সময় বসিরহাটের স্বরূপনগর থেকে শুরু করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা ছিল গরু পাচারের ‘করিডর’।
অভিযোগ, এই গরু পাচারচক্রের সঙ্গেই জড়িয়ে পড়েছিলেন এই আবদুল বারিক বিশ্বাস৷ সে গরু পাচারকারীর যেসব মাথা ছিল, সেসময় তাদের সঙ্গে বারিক বিশ্বাসের সুসম্পর্ক তৈরি হয়। স্থানীয়দের দাবি, এরপরই বারিক বিশ্বাস গরু পাচার এবং সোনা পাচারের ‘ডন’ হয়ে ওঠেন৷ শুধু উত্তর চব্বিশ পরগনা নয় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত দিয়ে গরু সোনা সহ বিভিন্ন জিনিস পারাপারে তার যোগ সামনে আসে। কয়েক বছরের মধ্যে বারিক বিশ্বাস হয়ে ওঠে বসিরহাটের বারিক ভাই।
বারিক ভাই বলেই তাঁকে ডাকতে থাকে এলাকার মানুষ। এই বারিক বিশ্বাসের দাদা এবং তাঁর পরিবারের অন্যান্য ভাইরা তৃণমূলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত বলে জানা যায় এবং এই বারিক বিশ্বাসের দাদা তৃণমূলের স্থানীয় নেতা বলেও পরিচিত।
আরও পড়ুন : টুলু মণ্ডলের ‘হিস্ট্রি’ অনেক! লরির ড্রাইভার থেকে খাদান মালিক…একেবারে সিনেমার মতো উত্থান! ১৫ কেজি সোনা, কোটি টাকার পিছনের গোটা গল্প
২০১৫ সালে প্রচুর সোনা-সহ বারিক বিশ্বাসকে গ্রেফতার করেছিল শুল্ক দফতর। কয়েক বছরের জন্য জেলেও গিয়েছিলেন। পরে অবশ্য জামিনে মুক্তি পান। গড়ে তোলেন বেসরকারি কলেজ৷ এরপর বারিক বিশ্বাস বেশ কয়েকবার পুলিশের হাতে ধরাও পড়ে। তাঁর বাড়িতে ED রেড করেছিল রেশন দুর্নীতি তদন্তের সময়। কারণ, এলাকায় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ‘ঘনিষ্ঠ’ হিসাবেই ছিল তাঁর পরিচিতি৷
বসিরহাটের বারিক বিশ্বাসের বিয়াই, অর্থাৎ সম্বন্ধী হল বীরভূমের খাদান ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল৷ ঘটনাচক্রে, যাঁরও কর্মজীবন শুরু ট্রাক ড্রাইভার হিসাবে৷ পরে পাথর খাদানের মালিক৷
২০২৪ সালে বীরভূমের এই টুলু মণ্ডলের মেয়ের সঙ্গে বসিরহাটের বারিক বিশ্বাসের ছেলের বিয়ে হয়। বিয়েতে কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল বলে সেই সময় অভিযোগ ওঠে৷ তদন্তের দাবি তোলেন সিপিএম, বিজেপির মতো তৎকালীন বিরোধীরা৷ বিয়ের অনুষ্ঠানে সেই সময় রাজ্যের বিভিন্ন তৃণমূলের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সরকারি আধিকারিক এবং টলিউডের বিভিন্ন অভিনেতা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে জানা যায়।
অনুষ্ঠানে ঢুকতে গেলে হাতে বিশেষ রিস্ট ব্যান্ড লাগিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়েছিল। অনুষ্ঠানের ভেতরে কারোর কোনও ছবি তোলার অনুমতি ছিল না। বাইরে থেকে সিকিওরিটি গার্ড দিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছিল।
আরও পড়ুন : খেতে খেতেই শত্রুঘ্ন সিনহার সঙ্গে কথা বলছেন জে পি নাড্ডা, পাশে সৌগত রায়ও! মমতা শিবিরে ফের ধস? তুমুল জল্পনা
বারিক বিশ্বাস ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাচারের অন্যতম অভিযুক্ত ছিল বলে জানা যায়৷ ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাচার করত পরিবর্তে সেই সময় বাংলাদেশ থেকে সোনা নিয়ে আসা হত ভারতে। অভিযোগ ওঠে এই চক্রের মাথা ছিল নাকি বারিক বিশ্বাস। বসিরহাটের সাকচুড়া এলাকায় বারিত বিশ্বাসের আদি বাড়ি। ২০১৪ সালে দেগঙ্গার কালিয়ানি বিল এলাকায় বারিক বিশ্বাসের একটি গাড়ি আটক করে ভারতীয় শুল্ক দফতর৷ গাড়িতে উদ্ধার হয় ৪২ কিলো ২০০ গ্রাম সোনা। পরবর্তীকালে, সাদা বালি ও কয়লা ব্যবসার সঙ্গে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল বারিক বিশ্বাস। বসিরহাটের সাংসদ প্রাক্তন হাজি নুরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ ছিল বলে জানা যায়।