দীক্ষা ভুঁইয়া: আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের কথা উঠলেই সাধারণত ক্যারাটে, তাইকোন্ডো বা জুডোর নামই সবার আগে মনে আসে। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম কার্যকর আত্মরক্ষা পদ্ধতি ‘ক্রাভ মাগা’ (Krav Maga) বেশিরভাগ মানুষের কাছেই অজানা।
ক্রাভ মাগা কোনও প্রচলিত মার্শাল আর্ট নয়। এটি বাস্তব জীবনের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দ্রুত আত্মরক্ষার জন্য তৈরি একটি যুদ্ধকৌশল, যার মূল লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে অল্প সময়ে নিষ্ক্রিয় করে নিজেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।
এই কৌশলের উদ্ভাবক ছিলেন ইমি লিশটেনফেল্ড (Imi Lichtenfeld বা Imi Sde-Or)। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে ইউরোপে নাৎসি-সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলার মুখে ইহুদি সম্প্রদায়ের মহিলাদের আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তুলতে তিনি বিভিন্ন বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই কৌশল গড়ে তোলেন।
পরবর্তীকালে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই পদ্ধতিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আরও উন্নত করা হয় এবং ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)-র হ্যান্ড-টু-হ্যান্ড কমব্যাট প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে এটি সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং নিরাপত্তা সংস্থার বাইরে সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রাভ মাগার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ। এখানে দীর্ঘক্ষণ লড়াই বা প্রতিযোগিতার কৌশলের পরিবর্তে গুরুত্ব দেওয়া হয় দ্রুত প্রতিক্রিয়া, প্রতিপক্ষের দুর্বল স্থানে কার্যকর আঘাত এবং নিরাপদে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে আসার ওপর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্রাভ মাগা শুধু ইজরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক মানুষও এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। বিভিন্ন দেশে স্কুল, কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ হিসেবে ক্রাভ মাগাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে নারী নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে।
ভারতেও ক্রাভ মাগার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যদিও তা এখনও সীমিত পরিসরে। স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ (SPG)-সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা এই ধরনের ক্লোজ-কোয়ার্টার কমব্যাট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এছাড়া দেশের কিছু বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও ক্রাভ মাগা শেখানো হয়। বিশ্বের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা ও ভিআইপি প্রোটেকশন ইউনিটও এই কৌশলের বিভিন্ন দিককে তাদের প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নারী ও কিশোরীদের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে ক্রাভ মাগার মতো বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণকে আরও বিস্তৃতভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
উল্লেখ্য, ক্যারাটে, তাইকোন্ডো বা জুডোর মতো মার্শাল আর্টের নিজস্ব ক্রীড়া-নিয়ম ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে, ক্রাভ মাগা মূলত বাস্তব জীবনের সংকটময় পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার জন্য তৈরি একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে জয়-পরাজয় নয়, বরং নিজেকে নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।